অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১০ বছরে রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় সোনা চোরাচালানের মামলা হয় ৬২টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র একটি। এছাড়া ২৬টি মামলায় পুলিশ ১০৪ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। অপর ৩৬টি মামলা তদন্তাধীন। অভিযোগপত্রভুক্ত একজন আসামিও চোরাচালানের মূল কারিগর নয়। ৬৩ আসামিই সোনা বহনকারী। আসামিদের মধ্যে আটজন ভারতীয় নাগরিক। এ ছাড়া ৩৩ জন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী। এদের মধ্যে আছেন-এনএসআই, সিভিল এভিয়েশন, শুল্ক গোয়েন্দা ও কাস্টমসের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা।
আরও জানা গেছে, কোনো মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়ার আগে পিপির (পাবলিক প্রসিকিউটর) অনুমোদন নেয়ার রীতি রয়েছে। কিন্তু সোনা চোরাচালান মামলায় ঢাকা মহানগরে এটি অনুসরণ করা হয় না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু বলেন, ‘সোনা চোরাচালান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা আমার কাছ থেকে কোনো অনুমোদন না নিয়েই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করছেন। যা আইনসিদ্ধ নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সোনা চোরাচালানকারি মূল হোতাদের পুলিশ চিহ্নিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে পুলিশের দেয়া এসব দুর্বল অভিযোগ পুনরায় তদন্তে পাঠানোর আদেশ দিতে পারেন। আমি মনে করি, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আসল ক্রিমিনালদের চিহ্নিত করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারে তদন্ত সংস্থা।’
পিপির বক্তব্যের বিরোধিতা করেন ঢাকার মহানগর পুলিশের উত্তরা জোনের ডেপুটি কমিশনার নিসারুল আরিফ। তিনি রোববার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘সোনা চোরাচালান মামলায় পিপির মতামত নেয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। যে কারণে এসব মামলায় তার মতামত না নিয়েই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়া হচ্ছে।’
অপরদিকে তদন্ত প্রসঙ্গে ডিসি নিসারুল আরও বলেন ‘সোনা চোরাকারবারিরা অনেক ধূর্ত। এর সঙ্গে জড়িতরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চোরাচালান অব্যাহত রেখেছে। আমরাও চেষ্টা করছি মূল হোতাদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে আদালতের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেয়ার।’ তিনি জানান, বিমানবন্দরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ ২২টি সংস্থার লোকজন দায়িত্ব পালন করে থাকেন। যাদের অধিকাংশই সোনা চোরাচালানে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গডফাদাররা গ্রেফতার না হওয়ায় সোনা চোরাচালান বহুগুণ বেড়েছে। চলতি বছরের পাঁচ মাসে ঢাকা মহানগরীতে ১৯টি মামলা হয়। ১০৫ কেজি স্বর্ণসহ একাধিক চোরাচালানি ধরা পড়ে। ২০১৩ সালে ২৬টি মামলা, ২০১১ সালে ৪টি, ২০০৯ সালে ৩টি এবং ২০০৮ সালে ৪টি মামলা হয়। এছাড়া ২০১২, ২০১০, ২০০৭, ২০০৫ ও ২০০৪ সালে একটি করে সোনা চোরাচালান মামলা হয়।
সোনা চোরাচালানের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিমানবন্দর থানার ওসি শাহ আলম বলেন, ‘সিভিল এভিয়েশনসহ বিভিন্ন সংস্থার অনেকেই সোনা চোরাকারবারিদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। যাদের বিরুদ্ধে মামলাও হচ্ছে। আসামি গ্রেফতার হওয়ার পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশই বহনকারী।’
জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, ‘চোরাচালানকারিদের গ্রেফতার করে বিমানবন্দর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ এসব মামলা তদন্ত করে। তদন্তের ব্যাপারে আমরা কিছুই বলতে পারব না। গ্রেফতার করার পর আমাদের আর কোনো ভূমিকা নেই।’
দৈনিক যুগান্তরের সৌজন্যে।