কঠিন সময়ে শ্রমবাজার

হঠাৎ করেই কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছে দেশের জনশক্তির বাজার। দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকা বৃহৎ বাজারগুলো খুলছে না। পাওয়া যাচ্ছে শুধুই আশ্বাস। মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় জনশক্তি প্রেরণ একপ্রকার থমকে গেছে। এগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট বার্তাও পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন শ্রমবাজার খোঁজার নানান উদ্যোগও সফলতার মুখ দেখেনি। অদক্ষ শ্রমিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সবাই। এর মধ্যেই চলতি বছরে সাত লাখ জনশক্তি প্রেরণের টার্গেট নেওয়া হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সফল হলে চ্যালেঞ্জ কমে আসবে। তবে বড় বাজারগুলো সচল করতে ও নতুন বাজার খুঁজতে কার্যকর ও সফল উদ্যোগ ছাড়া চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। জানা যায়, বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বাজার সচল করতে নানান কূটনৈতিক তত্পরতা চলছে। কিন্তু বাড়ছে না কর্মী নিয়োগের সংখ্যা। প্রধানমন্ত্রী নিজে কয়েকটি দেশ সফরে গিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেছেন। সে সময় কয়েকটি দেশ জনশক্তি নেওয়ার আগ্রহ দেখালেও পরে এর সুফল পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ৬ থেকে ৭ বছর ধরে বৈধপথে কর্মী নিয়োগ হচ্ছে না। মালয়েশিয়াতেও ৬ বছরের বেশি সময় ধরে বৈধভাবে কোনো কর্মী যেতে পারছেন না। মালয়েশিয়া ১৫ লাখ কর্মী নিয়োগের ঘোষণা শেষ পর্যন্ত ভেল্কিতে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে তেমন কোনো তথ্যও এখন দেওয়া হচ্ছে না। খোলা আছে সৌদি আরব। কিন্তু সৌদি আরবে এখন মহিলা কর্মী নিয়োগ করতে আগ্রহী। বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ মহিলা কর্মী নিতে আগ্রহ সেই পরিমাণ কর্মীও তারা পাচ্ছে না। সব মিলে জনশক্তির বাজারটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। সেখানে ১০ লাখের মতো বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। ২০১১ সালে আমিরাতে ২ লাখ ৮২ হাজার ৭৩৯ জন বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০১২ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে কর্মী গেছেন ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৫২ জন। কিন্তু ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে যায় দেশটির শ্রমবাজার। বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল মালয়েশিয়া। দেশটিতে ৬ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী আছেন। ২০০৯ সাল থেকে বড় এ শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে কুয়েতের শ্রমবাজার। দেশটিতে দুই লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। এখন পর্যন্ত বাজারটি উন্মুক্ত হয়নি। একই অবস্থা বাহরাইন, লেবানন, ওমান ও জর্দানেও।

বিএমইটি সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমবাজারগুলো বন্ধ হওয়ার পর জনশক্তি রপ্তানির হারও কমে গেছে। ২০০৯ সালে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৪ জন, ২০১০ সালে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭০২ জন, ২০১১ সালে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬২ জন, ২০১২ সালে ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৯৮ জন এবং ২০১৩ সালে ৪ লাখ ৯ হাজার ২৫৩ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালে ৩ লাখ ৮২ হাজার ২৯৮ জন কর্মী বিদেশে চাকরি নিয়ে গেছে। ২০১৫ সালে পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৬৬৭ জন কর্মী বিদেশে চাকরি পেয়েছেন। এখন ২০১৬ সালের টার্গেট ৭ লাখের বেশি কর্মী বিদেশ পাঠানো।

যদিও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি সম্প্রতি জানিয়েছেন, জনশক্তির বাজার বাড়াতে নতুন করে নানা পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। কর্মীদের বিদেশি ভাষায় পারদর্শিতা, প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অ্যাফিলিয়েশন করা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া, আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের চাহিদার আলোকে বিদ্যমান কোর্স কারিকুলামকে নিয়মিত আপগ্রেড করা, বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত প্রশিক্ষণের মান গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখার জন্য নিয়মিতভাবে মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। কর্মীরা দক্ষতা অর্জন করলে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ থেকেই কর্মী নেবে। তখন আর আমাদের জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো বেগ পেতে হবে না।

Comments (0)
Add Comment