গতকাল পর্যন্ত বিশ্বের ১১৮টি দেশে ১ লাখ ১৮ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৪ হাজার ৩০০ জন। যুক্তরাষ্ট্রে গতকাল পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন পর্যন্ত ১ হাজার ১৯৭ জন। মারা গেছেন ৩৮ জন। চীনের পর সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত দেশের তালিকায় রয়েছে ইরান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য। ইতালিতে মৃত্যুহার খুব বেশী। এ পর্যন্ত দেশটিতে ৬৩১ জন মারা গেছেন। জার্মানি আশঙ্কা করছে, তাদের দেশের ৭০ ভাগ লোক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন।
ইউরোপে করোনাভাইরাসের আধিপত্য দেখে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের ২৬টি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সত্যি কথা বলতে গেলে, রোগ কখনো আপন হয় না। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার অন্যতম মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। আমার মতে, সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। তারা আগামী ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত জরুরি পরিষেবা ছাড়া সকল প্রকার ভিসা স্থগিত করেছে। এমনকী প্রবাসী ভারতীয়রাও ১৫ এপ্রিলের আগে সেদেশে যেতে পারবেন না। এ পর্যন্ত ভারতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ৬৮ জন। ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশে এটি খুবই সামান্য।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প্র তার রাষ্ট্রীয় ভাষণে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় যা যা করণীয় তা উল্লেখ করেছেন। ট্যাক্স দায়ুক্তির কথাও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আগে তো বেঁচে থাকতে হবে। তারপর আসবে অন্য প্রসঙ্গ। অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার দিক েথেকে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র করোনাভাইরাস মোকাবেলায় কতটা দুর্বল তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসকে বিশ্বমহামারী ঘোষণা করেছেন। আমরা যারা যুক্তরাষ্ট্রে বাস করি, চীনে যখন করোনাভাইরাস সনাক্ত হলো, আমরা ভেবেছিলাম, বিজ্ঞানীরা এরইমধ্যে কিছু একটা আবিস্কার করে ফেলবেন। ঠিকই ভ্যাকনিক বেরিয়ে যাবে। কিন্তু না। এখন পর্যন্ত কোনো সুসংবাদ নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেটের মধ্যে ৪৪টি করোনা আক্রান্ত। নিউেইয়র্ক, নিউজার্সিসহ বেশ কয়েকটি স্টেটে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কলোরাডো ও নেভাদা সফর বাতিল করেছেন করোনাভাইরাসের ভয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বহু রাজ্যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সশরীরে ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে স্কুলগুলো বন্ধ না হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
করোনাভাইরাস নিয়ে যত আতঙ্ক মানুষের মাঝে কাজ করুক না কেন, মুনাভালোভী কিছু অমানুষ বিশ্ববাজারে একটা অস্থিরতা তৈরি করে বসে আছে। কতকিছুর কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বসে আছে তারা। উন্নয়নশীল দেশের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। উন্নত দেশগুলোর বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানগুলো করোনাভাইরাসকে পুজি করে ব্যবসা করা শুরু করলো। যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো বড়ো প্রতিষ্ঠান নেই যে তারা ২ ডলারের জিনিস ২০ ডলারে বিক্রি করছে না। কিন্তু কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাজার ব্যবস্থা একেবারেই ভেস্তে গেছে। কার কী-ই বা করার আছে। সবাইকেই তো প্রাণে বাঁচতে হবে আগে।
বিশ্বের যে বিপর্যয় সেদিক থেকে ভালো আছে আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের মানুষ অনেক ভালো। প্রশাসনও অনেক শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ আমার গর্ভধারিনী মা আছেন বাংলাদেশে। তাই সারাক্ষণ আমার প্রার্থনায় থাকে বাংলাদেশ করোনাভাইরাসমুক্ত থাকুক।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তাতে দেশের মানুষও সন্তুষ্ট। স্বাস্থ্য বিভাগ নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মানুষকে সচেতন করার। গণমাধ্যমের চেষ্টাও কম নয়। সরকার পরিচালনা যারা করছেন তাদের সব চেষ্টা সফল হোক। তারপরও বলবো, আগে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করা জরুরি। তাই, সবকিছু বিবেচনায় না নিয়ে সরকারের উচিত হবে, করোনাভাইরাসে আ্ক্রান্ত দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রমণ যোগাযোগ বন্ধ ঘোষণা করা। একবার ভুল বা খেয়ালীপনার কারণে যদি করোনাভাইরাস বাংলাদেশে বিস্তৃত হয় তাহলে আর শেষ রক্ষা হবে না। বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হবে না পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। ঘরবসতির শহর ঢাকা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হলে হয়তো ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের মত মধ্যম আয়ের দেশের জন্য অর্থনীতির ধকল পড়বে, যা কাটিয়ে ওঠা কিছুটা কঠিন হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যত লক্ষ্যগুলো বিলম্ব হবে। কিন্তু দেশের মানুষতো বাঁচবে।
তাই, সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সবার আগে বেঁচে থাকাটাই এসময়ের বড়ো চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে মানবিক মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রেখেই।
শহীদুল ইসলাম: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক। এভিয়েশননিউজবিডি.কম-এর প্রধান সম্পাদক এবং দৈনিক ইত্তেফাক-এর বিশেষ প্রতিনিধি। ইমেইল: dutimoy@gmail.com