মালয়েশীয় পুলিশের হয়রানির বিরুদ্ধে বাংলাদেশির আইনি পদক্ষেপ

মালয়েশীয় পুলিশের হয়রানির বিরুদ্ধে বাংলাদেশির আইনি পদক্ষেপ।

হয়রানিমূলকভাবে আটকের ঘটনায় মালয়েশীয় পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছেন এক বাংলাদেশি নাগরিক। বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার এবং পাসপোর্টের মেয়াদ থাকার পরও তাকে আটক করে ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছিল। আটকের দুই সপ্তাহ পরে তার বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়। আইনজীবীর সহায়তায় মুক্তি পেলেও মালয়েশীয় পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি ভুক্তভোগী মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (৩০)। সংবাদমাধ্যম ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে জানিয়েছে, অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনায় মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত ত্রুটির সমালোচনা করে মোয়াজ্জেমের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘সেলাঙ্গোর অ্যান্টি হিউম্যান ট্রাফিকিং কাউন্সিল।’ মালয়েশীয় সংস্থাটির একজন সদস্য বলেছেন, নাজিব রাজাকের সরকারের মতো মাহাথির মোহাম্মদের সরকারও সুষ্ঠু সমাধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। একমাত্র আদালতই পারে রায়ের মাধ্যমে অভিবাসীদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত দিকনির্দেশনা দিতে।

মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছ থেকে জানা গেছে, গত ১ অক্টোবর তাকে মালয়েশিয়ার পুলিশ অভিবাসন আইন ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেফতার করে। অথচ তখন তিনি বৈধভাবেই মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন। তার আইনজীবী জানিয়েছেন, মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন তার পাসপোর্ট বৈধ ছিল। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবৈধ বিদেশি কর্মীদের কাজ করার অনুমতি প্রদানের যে প্রক্রিয়া ঘোষণা করেছে, সে প্রক্রিয়ায় বৈধতা পেতে তিনি নিবন্ধনও নিয়েছিলেন। তারপরও মালয়েশিয়ার পুলিশ তাকে আটক করে। মোয়াজ্জেমের পক্ষে তার নিয়োগকর্তা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রাসঙ্গিক নথি উপস্থাপন করে তার নির্দোষ হওয়ার বিষয়টি বোঝাতে চাইলেও কাজ হয়নি; মুক্তি মেলেনি তার।

পরবর্তীতে মোয়াজ্জেমের আইনজীবী আদালতে যুক্তি উপস্থাপনের সময়ে আরেকটি মামলার উদাহরণ দেন, যেখানে আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকার সূত্রে আটক অভিবাসী কর্মীকে মুক্তি পেতে দেখা গেছে। এর প্রেক্ষিতে আদালত মোয়াজ্জেমকে মুক্তির আদেশ দেয়। এবার পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পালা। বাংলাদেশি মোয়াজ্জেম হোসেন তাকে হয়রানি করায় যে মামলা দায়ের করেছেন তার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে ১৫ জানুয়ারি থেকে।

এর মাধ্যমে সরকারের ‘কিছুটা হলেও হুঁশ ফিরতে পারে,’ মন্তব্য করে ‘সেলাঙ্গোর অ্যান্টি হিউম্যান ট্রাফিকিং কাউন্সিলের’ সদস্য আবদুল আজিজ ইসমাইল সংবাদমাধ্যম ফ্রি মালয়েশিয়া টুডেকে বলেছেন, মোয়াজ্জেমের ঘটনাটিই এ ধরনের একমাত্র ঘটনা নয়। সরকারের ‘রিহায়ারিং প্রোগ্রামে’ নিবন্ধিত হওয়া সত্ত্বেও অনেক অভিবাসী কর্মীকে আটক করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার দাবির মুখে তাদের কেউ কেউ মুক্তি পেতে সমর্থ হয়েছেন।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘রিহায়ারিং প্রোগ্রামে’ নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিলেন সাত লাখেরও বেশি অভিবাসী কর্মী। তবে এ প্রক্রিয়ায় সফলভাবে নিবন্ধিত হতে পেরেছেন মাত্র এক লাখ ১০ হাজারের কিছু বেশি। আবদুল আজিজ ইসমাইলের প্রশ্ন, ‘বাকিদের কী হবে? তাদের আটক করা হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ তারা বৈধ হওয়ার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছেন। তাদের বৈধতার প্রশ্নটি ঝুলে আছে। পুনর্বহাল করা হবে কি না, সে ব্যাপারে তাদের কোনও ধারণা নেই।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘রিহায়ারিং প্রোগ্রামের’ আওতায় নিবন্ধনের জন্য একজন বিদেশি কর্মীকে এক হাজার ১৩৪ দশমিক ৫২ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ হাজার ৯১৮ টাকা। এই হিসাবে এ নিবন্ধন প্রক্রিয়া থেকে কর্তৃপক্ষের মোট আয় হয়েছে ৮৪৫ মিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতেরও বেশি। কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পর তাকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে ঘোষণার কোনও অর্থ থাকতে পারে না, উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘এটা প্রকাশ্য দিবালোকে ডাকাতি’।

আবদুল আজিজ ইসমাইলের ভাষ্য, ‘নিবন্ধন প্রক্রিয়ার পুরোটাই ভুল। প্রথমে নির্ধারণ করা উচিত, একজন কর্মী তার নিবন্ধন পুনর্বহালের যোগ্য কি না। যদি যোগ্য হন, তাহলেই শুধু তাকে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। বিশাল সংখ্যক কর্মী অর্থ পরিশোধ করেছে অথচ তাদের বৈধতার প্রশ্নটি রেখে দেওয়া হয়েছে ধোঁয়াশার মধ্যে।’

ইসমাইল অভিবাসী কর্মী ইস্যুতে আগের সরকারের চাইতে ভালো কিছু করতে না পারার অভিযোগ তুলেছেন মাহাথির মোহাম্মদের সরকারের বিরুদ্ধে। প্রায় চার মাস আগে বিদেশি কর্মীদের ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত কমিটির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এই কমিটির সদস্যদের অধিকাংশেরই সমস্যাটি সম্পর্কে ভালো জানাশোনা বা বোঝাপড়া নেই। সরকারের উচিত ছিল, তাদের সংগঠনের মতো বিষয়টি নিয়ে কাজ করে এমন পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা।

তার ভাষ্য, ‘দুই রাজনৈতিক পক্ষের ওপর থেকেই আমাদের বিশ্বাস উঠে গেছে। একমাত্র বিকল্প হচ্ছে, আদালতের মাধ্যমে তাদের টনক নড়ানোর ব্যবস্থা করা। তারাই রায়ের মাধ্যমে বিধি নির্ধারণ করে দিতে পারেন, যার ওপর আমরা নির্ভর করতে পারব।’

বিদেশি কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া যে ব্যয়বহুল, সে বিষয়ে সরকারের কোনও বিবেচনা আছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই অধিকার কর্মী। মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মতে, অভিবাসী কর্মীদের বিরুদ্ধে দিনে গড়ে ৪০টি অভিযান পরিচালিত হয়। একেকটি অভিযানের খরচ পড়ে প্রায় ৩০ হাজার মালয়েশীয় রিঙ্গিত। অর্থাৎ, বছরে এই অভিযানে সরকারের ব্যায়ের পরিমাণ ৪০ মিলিয়ন রিঙ্গিত বা তারও বেশি।

আবদুল আজিজ ইসমাইল মনে করেন, চাকরিদাতাদের অপরাধের জন্য শ্রমিকদের শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল। কেননা, চাকরিদাতাদের কারণেই অনুমতির সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও অভিবাসীরা মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন। কর্মীদের ভিসা নবায়ন না করার জন্য দায়ি তাদের নিয়োগকর্তারা। যে অপরাধ কর্মীরা সংঘটন করেনি, তার জন্য কেন তাদের শাস্তি পেতে হবে?

তার মতে, অভিবাসী কর্মীদের সমস্যাগুলোর বিষয়ে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং একই সঙ্গে রক্ষা করবে শ্রমিকদের মানবাধিকার। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি কর্মীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই ধরনের নীতি প্রণয়ন করা উচিত।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.