পদ্মা সেতুর প্রভাবে যাত্রী হারাচ্ছে যশোর বিমানবন্দর
পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। সড়ক ও রেলপথে দ্রুত, সহজ এবং তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হওয়ায় আকাশপথের যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে যশোর বিমানবন্দরের ওপর। যাত্রীসংকটের কারণে ঢাকা–যশোর রুটে একের পর এক বেসরকারি এয়ারলাইনস ফ্লাইট কমিয়ে দিচ্ছে বা বন্ধ করছে। সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই থেকে এই রুটে সাময়িকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনস। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে একই কারণে নভোএয়ারও তাদের যশোর রুটের ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়।
যশোর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইউএস–বাংলা আগে সপ্তাহের সাত দিনই ঢাকা–যশোর রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করত। তবে যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে সব ফ্লাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে এই রুটে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্বল্প দূরত্বের এই রুটে যাত্রী কমে যাওয়ায় বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর জন্য ফ্লাইট পরিচালনা লোকসানজনক হয়ে পড়েছে। যশোর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে ইউএস–বাংলা জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে সাময়িকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম জানান, একসময় ঢাকা–যশোর রুটে প্রতিদিন ছয়টি পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনা করা হতো। পরে যাত্রীসংখ্যা কমতে থাকায় ধাপে ধাপে ফ্লাইট কমিয়ে একটি করা হয়। কিন্তু তাতেও প্রত্যাশিত যাত্রী পাওয়া যায়নি। তার মতে, একটি ফ্লাইট লাভজনকভাবে পরিচালনার জন্য উড়োজাহাজের অন্তত ৭০ শতাংশ আসন পূর্ণ থাকা প্রয়োজন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে আসন পূরণের হার ৫০ শতাংশের নিচে থাকায় পরিচালন ব্যয়ও উঠে আসছিল না।
২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই যশোর বিমানবন্দরে যাত্রী কমতে শুরু করে। এরপর ২০২৪ সালের শেষ দিকে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা–যশোর সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। দ্রুত, সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে অনেক যাত্রী সড়ক ও রেলপথ বেছে নেওয়ায় আকাশপথের চাহিদা আরও কমে যায়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে যশোর বিমানবন্দর দিয়ে মোট ৪ লাখ ৫ হাজার ৯০০ জন যাত্রী যাতায়াত করেছিলেন। পরবর্তী অর্থবছরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ২১ হাজার ৭০ জনে। আর সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে যাত্রীসংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৪৮ হাজার ৪০৮ জনে। অর্থাৎ মাত্র চার অর্থবছরের ব্যবধানে যাত্রী কমেছে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি, যা বিমানবন্দরটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে আগে বরিশাল বিমানবন্দরও পড়েছিল। পদ্মা সেতু চালুর পর সেখানে একে একে বেসরকারি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ওই রুটে শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে যশোর বিমানবন্দরও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন রুট চালু, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া নির্ধারণ এবং আঞ্চলিক বিমান চলাচল সম্প্রসারণের মাধ্যমে যাত্রী আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।