শতাব্দীকালের ভয়াবহ মহামারি করোনা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে অগণিত মানুষের। তছনছ করে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা। ধ্বংস করে দিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। মানবজাতিকে দাঁড় করিয়েছে নজিরবিহীন বিপদের মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্রের জনজীবন এবং অর্থনীতিও করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত। দেশটির অবস্থান এখন বিশ্বে করোনাক্রান্ত ও প্রাণহানির দিক থেকে শীর্ষে। সবচেয়ে বেশি মানুষের লাশ পড়েছে নিউইয়র্কে। করোনাকালে হটস্পট হয়ে উঠে নিউইয়র্ক সিটি।
প্রায় নব্বই লক্ষ বাসিন্দার এ নগরীতে করোনা প্রাণ কেড়েছে ২৩ হাজার মানুষের। প্রকৃত হিসেবে এ সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়াবে। প্রায় আড়াই’শ বাংলাদেশি অভিবাসীও রয়েছে এ তালিকায়। মৃত স্বদেশী ও স্বজন হারানোর বেদনা অপ্রশমিত রয়ে গেছে এখনো।
নিউইয়র্কে প্রকোপ কিছুটা কমেছে কোভিড-১৯ এর। কিন্তু প্রাদুর্ভাব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আবার ফিরে আসছে এমন আভাস ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
দীর্ঘ লকডাউনের অবসান ঘটছে ক্রমান্বয়ে। পুনরুজ্জীবনের পথে নিউইয়র্ক সিটি। বাংলাদেশি কম্যুনিটি ও অন্যান্যদের মতো নূতন স্বাভাবিকতার অপেক্ষায় নিউইয়র্কবাসী। প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি অভিবাসীর এ কম্যুনিটি তারপরও বুক বাঁধতে পারছে না। মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুন পর্যন্ত ভীতি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেই পুরো সময় কেটেছে সবার।
কথা ছিলো জুলাই মাসে ধাপে ধাপে সিটির সবকিছু খুলে দেয়ার। কিন্তু নানাবিধ জটিলতার সম্ভবনা থেকে আশানুরুপ কোন অগ্রগতি নেই তৃতীয় ধাপেও। হাতেগোনা গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবধরণের ব্যবসায় মারাত্মক ধ্বস নেমেছে। নজিরবিহীন বেকারত্ব, জীবন-যাত্রায় বিরাজমান অস্বাভাবিকতায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের মাঝে নেমে এসেছে এক ধরনের হতাশা, উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। এ সবের সাথে যোগ হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমিগ্র্যান্ট বিরোধী নীতি নির্দেশনা। এ সংক্রান্ত সমস্যায় আতঙ্কে আছেন আনডকুমেন্টেড বাংলাদেশিরা।
করোনাকালে সবচেয়ে দীর্ঘায়িত ও কঠোর লকডাউনের কারণে নিউইয়র্কের অর্থনীতি কার্যত ভেঙ্গে পড়ে। সিটির জরুরী কিছু বিভাগ ছাড়া সবকিছুই এসময় ছিলো অচল। লকডাউনকালে প্রতিদিন সিটি কর্তৃপক্ষকে লোকসান গুনতে হয়েছে ১৭৩মিলিয়ন ডলার। বহুজাতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এ নগরীতে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৬ লক্ষ।
বিশাল এ কর্মী বাহিনীর সিংহভাগ মানষের প্রধান কর্মস্থল রেস্টুরেন্ট, বার, হোটেল, থিয়েটার ও রিটেইল স্টোরস। এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ, সুপারমার্কেট ও ট্রান্সপোর্টেশন বিভাগে কাজ করে বহু মানুষ। নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে বেশীর ভাগই কাজ করতেন রেস্টুরেন্ট, ট্রান্সপোর্টেশন ও রিটেইল স্টোরে। করোনাকালে এসব কর্মস্থল থেকে চাকুরী হারান সাড়ে ৮ লাখ মানুষ।
ফলে নিউইয়র্কে বেকারত্বের হার ৩.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮.৩ শতাংশে। করোনার কারণে সারা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চাকরি হারায় ৪ কোটির অধিক আমেরিকান। বিগত ৪৪ বছরের ইতিহাসে বেকারত্বের এ হার সর্বোচ্চ। করোনায় সৃষ্ট মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে প্রাথমিকভাবে ফেডারেল সরকার বয়স্ক নাগরিকদেও জন্য এককালীন ১২‘শ এবং সন্তানদের জন্য ৫০০ ডলার করে প্রণোদনা চেক প্রদান করে।
নিউইয়র্ক রাজ্য সরকার বেকার ভাতা প্রদানের ঘোষণা দিলে হিড়িক পড়ে যায় আবেদনের। যারা সরাসরি চাকুরী হারান তাদের পাশাপাশি সেলফ এমপ্লয়েড যারা তারাও বেকার ভাতা পাচ্ছেন মার্চ মাস থেকে। এছাড়া করোনাকালে শুরু হওয়া প্যানডেমিক ভাতা বাবদ প্রতি সপ্তাহে অতিরিক্ত ৬০০ ডলার করে দেয়া হচ্ছে। জুলাই মাসে শেষ হয়ে যাবে প্যানডেমিক ভাতার সুযোগ। চাকুরী হারালেও সবকিছু মিলিয়ে জুলাই পর্যন্ত অনেকের দিন ভালোই কাটছিলো প্যানডেমিক আর্থিক সুবিধা পেয়ে।
আগষ্টেই আবার তাদের জন্য শুরু হবে কঠিন সময়। পুরনো কর্মস্থলে খুব কম মানুষই ফিরতে পারবেন সহসা। এজন্য চাকুরীজীবীদের আরো অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। এনিয়ে বেকারদের মাঝে একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এছাড়া যারা কর্মস্থল থেকে হেলথ ইন্সুরেন্স সুবিধা পেয়ে আসছিলেন চাকুরী চলে যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে সে সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ৫৪ লাখ মানুষ হেলথ ইন্সুরেন্স হারিয়েছে। নিউইয়র্কেও এদের সংখ্যা অনেক।
ব্যবসার ক্ষেত্রেও তেমন ভালো কোন লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন না বাংলাদেশিরা। করোনার শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে কম্যুনিটির ৯০ শতাংশ ব্যবসা। পরে গ্রোসারী, সুপার মার্কেট, ফার্মেসী সহ কতিপয় ব্যবসা কার্যক্রম শুরু হয়। এসব ব্যবসাও চলছিলো সীমিত আকারে। নিউইয়র্ক সিটি খুলে দেয়ার তৃতীয় ধাপে এসে কোন কোন ব্যবসায় কিছুটা প্রাণ ফিরে এসেছে।
নিউইয়র্ক সিটির ৯৮ শতাংশই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের অন্তর্ভূক্ত। কর্মচারী কর্মকর্তার সংখ্যা ১০০ জনের কম এমন প্রতিষ্ঠানই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের আওতায় পড়ে। প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ কাজ করে সিটির ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। বলতে গেলে এরাই নিউইয়র্ক সিটির প্রাণ। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
মহামারির শুরুতেই পাততারি গুটাতে হয় তাদেরকে। আমেরিকার অর্থনীতিতে ৪৪ শতাংশের যোগান দেয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুযায়ী গত মার্চের পর ১ লাখ ১০ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশব্যাপী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য দুই ধরনের প্রনোদনা ঋণের ব্যবস্থা করেছে ফেডারেল সরকার। এপ্রিলে বরাদ্দ দেয়া হয় ৬৬০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু তাতে প্রাণ পায়নি ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশি কম্যুনিটির অনেকেরই রয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা। রেস্টুরেন্টগুলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের আওতায় পড়ে। করোনাকালে তাদের মাথায় হাত পড়েছে।
অনেক রেস্টুরেন্টের মালিকানায় রয়েছে অভিবাসী বাংলাদেশি। ম্যানহাটান সহ প্রায় প্রতিটি বরোতেই বাংলাদেশিদের রেস্টুরেন্ট আছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিউইয়র্ক সিটিতে রেস্টুরেন্টের সংখ্যা ২৬ হাজার ৬১৮টি। আর রেস্টুরেন্ট কাম বার রয়েছে ১ হাজার ৬০০টি। এসব রেস্টুরেন্টে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি চাকরি করেন। ভালো অর্থও উপার্জন করেন তারা।
অনেক রেস্টুরেন্ট একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে করোনাকালে। গ্রাহকের অভাবে খুলতে পারছে না অনেক রেস্টুরেন্ট। জীবন যাত্রায় অস্বাভাবিকতা এখনো কাটেনি। তাছাড়া সিটির রেস্টুরেন্টের গ্রাহকদের বড় একটি অংশ পর্যটক। করোনার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন নিউইয়র্ক শহরে অর্ধ লক্ষাধিক পযর্টকের আনাগোনা চলতো।
এখন কোন পর্যটক নেই। তৃতীয় ধাপে সিটির রেস্টুরেন্ট গুলোতে স্বল্প পরিসরে ইনডোর সার্ভিস শুরুর কথা থাকলেও তা হয়নি। প্রায় ৭ হাজার রেস্টুরেন্ট মালিক আবেদন করেছে বাইরে গ্রাহকদের বসার সুযোগ দিতে। অনেক এলাকায় চালু হয়েছে আউটডোর সার্ভিস। তবে বাংলাদেশি অধ্যুষিত রেস্টুরেন্টগুলোতে এ ধরণের সার্ভিস খুব একটা চালু হয়নি।
বাংলাদেশি গ্রাহকরা সাধারণত খাবার বাসায় নিয়ে যান। তারা রেস্টুরেন্টে বসে খেতে এখনও ভীত। তাছাড়া বাংলাদেশিরা বাইরে বসে খেতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না বলে জানান জ্যামাইকায় একজন রেস্টুরেন্ট মালিক। নানাকারণে রেস্টুরেন্টগুলোর চেয়ার এখন টেবিলের উপর উল্টোভাবে শোভা পাচ্ছে। গ্রীষ্মে রেস্টুরেন্টগুলোর ব্যবসায় ছিলো রমরমা। এবার বনভোজন ও অনুষ্ঠান নেই। অপরদিকে কম্যুনিটির পার্টি হলগুলো বন্ধ থাকায় মালিকদের মাথায় হাত পড়েছে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশিদের একটি অংশ ইয়েলো ট্যাক্সি চালকের পেশায় নিয়োজিত। কথিত আছে যে নিউইয়র্ক সিটির ইয়েলো ট্যাক্সির সংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশি চালকের সংখ্যা বেশি। সিটির ট্যাক্সি এন্ড লিমোজিন কোম্পানীর পরিসংখ্যানানুযায়ী মোট মেডালিয়ান ইয়েলো ট্যাক্সির সংখ্যা ১৩ হাজার ৫৮৭টি। আর এসব ট্যাক্সির জন্য লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা ৫১ হাজার ৩৫৮জন। একটি ট্যাক্সির জন্য গড়ে চালক প্রায় ৪জন।
তন্মধ্যে বাংলাদেশি চালকের সংখ্যা ১১ হাজার। তবে প্রকৃত সংখ্যা ১৪ হাজার বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক বাংলাদেশি কাজ করছেন উবার চালক হিসেবে। করোনাকালে এদের কাজ চলে গেছে। বেকার ভাতাই এখন তাদের ভরসা। কেউ কেউ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। কিন্তু যাত্রী তেমন না থাকায় জমার অর্থ সংকুলান করা যাচ্ছে না বলে জানান কয়েকজন ট্যাক্সি চালক।
অপরদিকে রিয়েল এস্টেট, ট্রাভেল এজেন্ট, টিউটোরিয়াল, ভেন্ডারসহ সবধরনের ব্যবসায়েই ধ্বস নেমেছে বড় ধরনের। সংবাদপত্র, প্রিন্টিং ব্যবসায় সহ কোন কিছুতেই প্রাণ ফিরছে না। কবে কখন ফিরবে এমন গ্যারান্টিও নেই। সবকিছু মিলিয়ে গোটা নিউইয়র্কবাসীর মাঝেই বিরাজ করছে চরম হতাশা। স্কুল, কলেজ বন্ধ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরে স্বাভাবিক জন সমাগমের উপর নিষেধাজ্ঞা এখনো বর্তমান।
সন্তানদের নিয়ে ঘরে বন্দী থেকে মানসিক দিক থেকেও ভেঙ্গে পড়ছেন অনেকে। ইমিগ্রেশনের খড়গ ঝুলছে অনেকের মাথার উপর। বাংলাদেশি কম্যুনিটিতে অনেক বাড়ির মালিক ও ভাড়াটের মাঝে চলছে শীতল যুদ্ধ। বেকার ভাতা ভোগ করার পরও অনেকে বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করছেন না এ ধরণের অভিযোগ আছে মালিক পক্ষের।
করোনার কারণে বাড়ি ভাড়া মওকুফ হবে এমন আশা থেকেই বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন না অনেকে। ভাড়া না পাওয়ার কারণে অনেক মালিক হিমশিম খাচ্ছেন মর্টগেজ লোন পরিশোধ করতে। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশি কম্যুনিটিও ঘুরপাক খাচ্ছে বহুমুখী সংকটে।
ডা. ওয়াজেদ খান : প্রকাশ, মানবজমিন
২৩ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার, ২:৩৩ | সর্বশেষ আপডেট: ১০:৫১
-সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউইয়র্ক।