আতঙ্কিত বিমানের পাইলটরা। করোনাভাইরাস মহামারী পরিস্থিতিতে প্রায় দেড় বছরের কর্তিত বেতন ফিরে পাওয়ার দাবিতে চাপ দেওয়ার ‘খেসারত’ দিতে হয়েছে বিমানের সিনিয়র পাইলট ও বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানকে। বিমান কর্র্তৃপক্ষ বাপার এই দাবি ঠিকই মেনেছে তবে তাকে চাকরিচ্যুতও করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে বিমান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিমান কর্মকর্তারা জানান, বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এসডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ক্যাপ্টেন মাহবুবকে চাকরিচ্যুতির বিষয়টি জানানো হয়।
কোনো ধরনের কারণ দর্শানো বা শ্রম আইনের ধারা অনুসরণ না করে পর্ষদের ক্ষমতাবলে তাকে চাকরিচ্যুত করায় পাইলটদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, এ ঘটনায় বিমানের জন্য খারাপ পরিণাম ডেকে আনবে। এমনকি পরিস্থিতি যে কোনো সময় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
জানতে চাইলে বিমানের এমডি ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল বলেন, ‘ব্যবস্থা নেওয়ার বিভিন্ন প্রক্রিয়া আছে। আছে টার্মিনেশন, ডিসমিস ও বিভাগীয় ব্যবস্থা। উনাকে টার্মিনেশন করা হয়েছে। কাজেই এটা আইনানুযায়ীই করা হয়েছে।’
বিমান প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে চাকুরিচ্যুতির ওই চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এতে বলা হয়েছে অ্যাসোসিয়েশেন অব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডের আর্টিক্যাল ৫৯(বি) এর ক্ষমতাবলে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল এই চাকরিচ্যুতির আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে গত ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিমানের ২৬৫তম বোর্ড সভার দেওয়া ক্ষমতাবলে বিমান এমডি এই চাকরিচ্যুতির আদেশ দেন।
অবিলম্বে এই আদেশ কার্যকর করতে বিমানের প্রশাসন শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চিঠিটি মঙ্গলবার দুপুরেই তড়িঘড়ি করে ই-মেইলে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানের কাছে পাঠানো হয়েছে। চাকরিকালে কোনো বকেয়া পাওনা থাকলে তা পরিশোধ করে দেওয়া হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার বিমানের সদরদপ্তর বলাকা ভবনে সরেজমিনে গিয়ে পাইলটদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে। বিকালে জরুরি বৈঠক ডেকেছে বাপা নির্বাহী কমিটি।
বিমানের কয়েকজন পাইলট বলেন, ক্যাপ্টেন মাহবুবের চাকরিচ্যুতির ঘটনায় তারাও আতঙ্কে আছেন। আর এ অবস্থায় কোনো পাইলটের পক্ষে ফ্লাইট পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যাপ্টেন মাহবুব বিমানের সব পাইলটের পক্ষে আন্দোলন করেছেন। বাপার নির্বাহী কমিটি এবং বাপার সব সদস্যের সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি গণমাধ্যমে কথা বলেছেন।
তাদের দাবি, নোটিস না দিয়ে হঠাৎ তড়িঘড়ি করে একটি রেজিস্টার্ড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিকে চাকরিচ্যুত করা সম্পূর্ণ অবৈধ। বিমান এমডি কোনোভাবেই এই আদেশ দিতে পারেন না। যে কোনো কর্মকর্তা কিংবা পাইলটকে চাকরিচ্যুত করা যায়। কিন্তু সেই জন্য নিদিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। আগে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে হবে, তাকে নোটিস দিতে হবে এবং অভিযুক্ত সে নোটিসের জবাব দেবেন। মাহবুবের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
বিমানের পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানের চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে কোনো কারণ উল্লেখ না করা হলেও দায়িত্বশীল একটি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিমানের কাতার, দুবাই, ওমান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট সিডিউল ল-ভ- হওয়ার পেছনে বাপা সভাপতির হাত রয়েছে বলে বিমান কর্র্তৃপক্ষ মনে করছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা বাপা সভাপতির নেতৃত্বে পাইলটরা কৃত্রিম পাইলট সংকট তৈরি করে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন।
পাইলটদের বেতন সমন্বয় না করায় তারা মাসে ৭৫ ঘণ্টার বেশি ফ্লাইট চালাবেন না বলে এর আগে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। বারবার আন্দোলন করার পরও বিমান কর্তৃপক্ষ পাইলটদের দাবি পূরণ না করায় তারা মাসে ৭৫ ঘণ্টার বেশি ফ্লাইট এবং ৮ দিনের কম ডে-অফ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ কারণে শুধু বাপা সভাপতিকে অপসারণ করা হয়েছে। যাতে অন্যরা সতর্ক হয়ে যান।
পাইলটদের অভিযোগ ছিল, করোনা মহামারীর কারণে অর্থ সাশ্রয় করতে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ হারে পাইলটদের বেতন কর্তন করা হয়। আন্দোলনের পর কর্তৃপক্ষ গত মাসে সেটা আবার সমন্বয় করেছে। কিন্তু উড্ডয়ন ভাতা ঘণ্টার অনুপাতিক হারে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেটা বাতিল করেনি। অথচ এ ভাতা তাদের মূল বেতনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কারণে মোট বেতনের ক্ষেত্রে জুনিয়র পাইলটদের ৪৮ শতাংশ এবং সিনিয়র পাইলটদের ২২ শতাংশ কমে গেছে। এ কারণে সপ্তাহ দুয়েক আগে আন্দোলনে নামেন পাইলটরা। তারা ফ্লাইট চালাতে অপারগতা জানান। ওই সময় বিমান প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পাইলটদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন।
ক্যাপ্টেন মাহবুবের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। বিমানের এমডিকে জিজ্ঞাসা করুন।’
সুত্র- দেশ রুপান্তর