বিমানের ১৪ বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ে হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন!

দরকষাকষি ছাড়া চুক্তি, নাকি ইতিহাসের বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি?

১৪ বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ে হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন: দরকষাকষি ছাড়া চুক্তি, নাকি ইতিহাসের বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিকে সরকার “যুগান্তকারী” হিসেবে আখ্যা দিলেও এর আর্থিক কাঠামো এবং ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে ইতোমধ্যে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী বিমান ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ কিনবে। ঘোষিত মূল্য প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

কিন্তু এই চুক্তির আড়ালে কি লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো আর্থিক বাস্তবতা?

ক্যাটালগ মূল্যে, নাকি নেগোসিয়েশন মূল্যে কেনা  হয়েছে উড়োজাহাজগুলো?

বিমান শিল্পে একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হলো, বোয়িং কিংবা এয়ারবাসের প্রকাশিত ক্যাটালগ মূল্য সাধারণত চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য নয়। বড় এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ডিসকাউন্ট আদায় করে থাকে।

এভিয়েশন খাতের বিভিন্ন সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বোয়িং ৭৮৭ সিরিজের উড়োজাহাজগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ক্যাটালগ মূল্যের তুলনায় কম দামে বিক্রি হয়। অথচ বিমানের সাম্প্রতিক চুক্তিতে সেই ধরনের কোনো বড় মূল্যছাড় আদায় করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, যদি প্রকৃতপক্ষে ক্যাটালগ মূল্যের কাছাকাছি দামে উড়োজাহাজ কেনা হয়ে থাকে, তাহলে দরকষাকষির মাধ্যমে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের সুযোগ কেন নেওয়া হলো না? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল যদি বিমানের চেয়ে কম খ্যাতিসম্পন্ন একটি এয়ারলাইন্স বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে আরো কম মূল্যে একই মানের একটি উড়োজাহাজ কিনতে পারে তাহলে বিমান পারবে না কেন?  বিমান তো একটি রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ার। বিমানের পেছনে একটি রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের উপদেষ্টা পরিষদ সম্পৃক্ত ছিলেন। বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা, হায়ার ক্লাসের লবিস্ট ফার্ম, মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিবরা সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সম্পৃক্ততা ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, বিডার চেয়ারম্যান পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সবচেয়ে বড় কথা হল  চুক্তিটি করা হয়েছে সরকার টু সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার পর। বাংলাদেশের পক্ষে সাবেক অন্তবর্তী  সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসেরও সম্পৃক্ততা ছিল। অথচ ছোট ছোট এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারাই boeing কোম্পানির কাছ থেকে দর কষাকষির মাধ্যমে আরো কম মূল্যে এ ধরনের উড়োজাহাজ ক্রয় করছেন এরকম দৃষ্টান্ত রয়েছে।

উড়োজাহাজ প্রতি কোটি কোটি ডলারের পার্থক্য

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি ড্রিমলাইনারের ক্ষেত্রে যদি মাত্র ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে ১০টি ড্রিমলাইনারেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকারও বেশি।

এই বিপুল অঙ্কের অর্থের যৌক্তিকতা কী? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিমান কর্তৃপক্ষ এখনো তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন অবশ্যই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বা সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা পর্যায়ে  কোনো না কোনো নেগোসিয়েশন হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠেছে ছাড়কৃত সে অর্থ কি সরকারের কোষাগরে জমা হয়েছে নাকি তা কারো না কারো পকেটেস্ত হয়েছে? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য  আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্ত হলে এরকম বড় কেলেঙ্কারির রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। অন্যথা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই সেটি ধামাচাপা পড়ে যেতে পারে।

সুদের বোঝা কত বড়?

চুক্তি অনুযায়ী উড়োজাহাজগুলোর ডেলিভারি শুরু হবে ২০৩১ সালে এবং শেষ হবে ২০৩৫ সালে।

অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কারণে মূল ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সুদ বা ফাইন্যান্সিং চার্জ যুক্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাঁচ বছর মেয়াদে একটি উড়োজাহাজ ডেলিভারি দেওয়া হলে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কমপক্ষে ২২ শতাংশ অর্থ অতিরিক্ত অর্থ বিমানকে গুনতে হতে পারে। এটি নিয়েও বিশ্বের অন্যান্য এয়ারলাইন্সগুলো নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে অর্থ কমিয়ে নেন।

তাদের বক্তব্য যদি ক্রয়মূল্যের ওপর প্রতিবছর অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় যুক্ত হয়, তাহলে চূড়ান্ত প্রকল্প ব্যয় ঘোষিত ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করতে শুধু ক্রয়মূল্য নয়, বরং সুদ, গ্যারান্টি ফি, বীমা ব্যয় এবং অর্থায়ন কাঠামোও প্রকাশ করা জরুরি।

এয়ারবাসকে বাদ দিয়ে বোয়িং কেন?

বিমান সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে বোয়িং ও এয়ারবাসের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল। পূর্ববর্তী সময়ে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্তও ছিল।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে বোয়িংয়ের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রশ্ন হলো, কোন কারিগরি, আর্থিক বা বাণিজ্যিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?

চুক্তি অনুমোদনের আগে কি কোনো স্বাধীন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করা হয়েছিল?

জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য এত বড় ক্রয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সেই মূল্যায়ন প্রতিবেদন কি প্রকাশ করা হবে?

কার স্বার্থে তড়িঘড়ি?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সময় নির্বাচন।

যে উড়োজাহাজগুলো ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে, সেগুলোর জন্য তড়িঘড়ি করে ২০২৬ সালেই এত বড় আর্থিক অঙ্গীকার কেন করা হলো? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল এত বড় একটা ক্রয় কেন একটি বিতর্কিত ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা হল? জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের মাধ্যমে এই চুক্তি করলে কি হত?

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, এত দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, আন্তর্জাতিক মূল্য যাচাই এবং স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

জবাবদিহি কোথায়?

সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের দাবি, একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই জানতেন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক চুক্তিতে দরকষাকষির গুরুত্ব কতটা।

তাহলে কেন এমন একটি চুক্তি সম্পাদিত হলো, যার আর্থিক কাঠামো এবং মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে এত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে?

তদন্তের দাবি

বিমান খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি নিয়ে একটি স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তদন্তে বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত—

  • প্রকৃত ক্রয়মূল্য ও ক্যাটালগ মূল্যের পার্থক্য;
  • বোয়িং কর্তৃক প্রদত্ত সম্ভাব্য ডিসকাউন্ট;
  • অর্থায়ন ও সুদের প্রকৃত কাঠামো;
  • প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না;
  • সিদ্ধান্ত গ্রহণে কারা জড়িত ছিলেন;
  • বাংলাদেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না।

কারণ ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি শুধু একটি উড়োজাহাজ ক্রয় নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের অর্থে পরিচালিত অন্যতম বৃহৎ আর্থিক অঙ্গীকার। আর সেই কারণে প্রতিটি ডলার ব্যয়ের হিসাব জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

–মু/মা

Comments (0)
Add Comment