চট্টগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত কথিত অসম বাণিজ্য চুক্তি বাতিল এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা না দিয়ে বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার দাবিতে মানববন্ধন করেছে ‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট’। বুধবার (১ জুলাই) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে সংগঠনের নেতারা দাবি করেন, এই চুক্তি দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, শিল্পখাত এবং সার্বভৌম স্বার্থের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি একতরফা ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেই বাংলাদেশের ওপর বিভিন্ন শর্ত আরোপ করেছে। এসব শর্ত কার্যকর হলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে, স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বক্তারা বলেন, চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছর আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কমপক্ষে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হতে পারে। পাশাপাশি প্রায় ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য কেনার বাধ্যবাধকতার কথাও উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে প্রতি বছর ৭ লাখ টন গম এবং কয়েক গুণ বেশি দামে প্রায় ২৬ লাখ টন সয়াজাত পণ্য ও তুলা আমদানির বিষয় রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
মানববন্ধনে আরও বলা হয়, গরুর মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং পোল্ট্রি পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে দেশের ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্প বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। এতে হাজার হাজার খামারি ও উদ্যোক্তা ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বক্তারা।
তারা আরও দাবি করেন, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে ৬ হাজার ৭১০টি মার্কিন পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে, অথচ বাংলাদেশের জন্য শুল্ক সুবিধা থাকবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে। এর ফলে সরকার বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে বলে তাদের বক্তব্য।
বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, কোনো আন্তর্জাতিক টেন্ডার ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ১৪টি বিমান কেনার চুক্তি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর বিষয়টিও চুক্তির অংশ বলে তারা দাবি করেন।
এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তুকি সীমিত বা বন্ধ করার শর্ত, জ্বালানি ও কৃষিখাতে ভর্তুকি কমানোর সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী বিবেচিত দেশগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ চুক্তির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগও তুলে ধরেন বক্তারা। এসব শর্ত দেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মত প্রকাশ করেন।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা অবিলম্বে এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালসহ কৌশলগত স্থাপনাগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে বিবেচিত সব ধরনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।