আটকে পড়া বাংলাদেশিদের যেভাবে ভারত থেকে ফেরানো হচ্ছে

পর্যটন বা চিকিৎসার জন্য কয়েক হাজার বাংলাদেশি লকডাউনের কারণে ভারতে আটকা পড়েছিলেন, তাদের একটা বড় অংশ এরমধ্যেই দেশে ফিরতে পেরেছেন। স্থল-সীমান্তগুলো দিয়ে যেমন তারা নিজ দেশে ফিরেছেন, তেমনি আকাশপথেও চেন্নাই, দিল্লি, কলকাতা বা মুম্বাই হয়ে ৫ মে’র মধ্যে হাজার দুয়েকেরও বেশি বাংলাদেশি দেশে ফিরবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রবিবারের (৩ মে) মধ্যেই হাজার দেড়েকের মতো লোক প্লেনে ফিরে দেশে পা রেখেছেন।

জানা গেছে, ভারতের নানা প্রান্ত থেকে বাংলাদেশিদের যেভাবে এক জায়গায় জড়ো করে দেশের বিমানে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেটা আসলে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনসহ কলকাতা, মুম্বাই, গুয়াহাটি বা আগরতলার দূতাবাসের কর্মীরা যেমন এর পেছনে রাতদিন খাটছেন, তেমনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ভারত সরকারের কর্মকর্তারাও। কিন্ত চেন্নাই, মুম্বাই, দিল্লি বা ব্যাঙ্গালুরে আটকে পড়া নাগরিকদের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের প্রথম দিকের পরামর্শ ছিল একটাই- যে যেখানে আছেন, সেখানেই ধৈর্য ধরে আরও কয়েকটা দিন থাকুন। ভারত সরকার যেহেতু তার নিজেদের নাগরিকদেরও একই ‘স্টে পুট’ উপদেশ দিচ্ছিলো, বাংলাদেশ দূতাবাসও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওই একই পরামর্শেই সায় দেয়।

প্রথম দিকে ‘স্টে পুট’ নীতিতে সব ঠিক থাকলেও সম্প্রতি সমস্যা দেখা দেয়, ভারত সরকার প্রথম দফার পর লকডাউন আরও ১৯ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

জানা যায়, যে বাংলাদেশিরা চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতাল বা ভেলোরের সিএমসি’তে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন, আত্মীয়-স্বজনসহ তাদের হাতের অর্থও ততদিনে ফুরিয়ে এসেছে। বাড়িভাড়া থেকে খাওয়া পর্যন্ত সবকিছুতেই তারা সমস্যায় পড়ছিলেন। এছাড়াও ট্র্যাভেল এজেন্টের সঙ্গে ভারত বেড়াতে এসে কেউ আটকা পড়েছেন মুম্বাইতে, কেউবা হায়দ্রাবাদে। ওদিকে পাঞ্জাব বা দিল্লির বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন যেসব বাংলাদেশি ছাত্র, কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়ায় তারাও বিপদে পড়েছেন। পাঞ্জাবের ছাত্ররা কেউ কেউ গিয়ে গুরুদুয়ারাতেও আশ্রয় নেন।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার এটা অনুধাবন করে, ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত কোনোক্রমে টেনে দিলেও আরও ১৯ দিন (হয়তো প্রয়োজনে আরও বেশি) লকডাউনের সময়ে ভারতে থাকা সম্ভব নয় এসব বাংলাদেশির জন্য। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান এরপর ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এই আশ্বাস পান যে, বাংলাদেশ সরকার যদি তার নাগরিকদের ফেরাতে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে তাহলে দিল্লি তাতে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এরপরেই ভারত থেকে বাংলাদেশিদের ফেরানোর জন্য বিশেষ ফ্লাইট চালাতে রাজি হয়ে যায় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স এবং বাংলাদেশ বিমান।

মুম্বাই এয়ারপোর্টে বাংলাদেশিদের আসতে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের অনুমতিপত্র
চেন্নাই থেকে ২০ এপ্রিল ঢাকাগামী প্রথম ফ্লাইটের যাত্রা চূড়ান্ত হতেই তৈরি করা হতে থাকে ইচ্ছুক যাত্রীদের তালিকা। হোয়াটসঅ্যাপে ও ফেসবুকের মাধ্যমে তাদের নির্ধারিত ফর্ম পাঠিয়ে যাবতীয় তথ্য যেমন: কোথায় আছেন, কতজন যাবেন, কীভাবে বিমানবন্দরে আসবেন প্রভৃতি তথ্য সংগ্রহ করা হতে থাকে। কীভাবে বাংলাদেশিরা ‘কোভিড মুক্ত’ থাকার সার্টিফিকেট জোগাড় করবেন, দেওয়া হয় সেই পরামর্শও।

তবে ভারতে লকডাউন থাকায় ট্যাক্সি পরিষেবা বা উবার বন্ধ হওয়ায় যাত্রীদের প্ল্যাটফর্মে বা এয়ারপোর্টে পৌঁছানো ব্যাপারে সমস্যা দেখা দেয়। এক্ষত্রে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব দাম্মু রাভি। প্রত্যেক যাত্রী যে স্থানীয় ট্যাক্সি সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তাদের প্রতিটি গাড়ি ও ড্রাইভারের নম্বর এবং জার্নির রুট দিয়ে বিশেষভাবে ভারত সরকার জারি করে একটি বিশেষ অনুমতিপত্র। এটাকেই সাধারণভাবে বলা হয় ‘রোডপাস’ অর্থাৎ রাস্তায় চলার অনুমতি। তার প্রতিলিপি যাত্রীদের ফেসবুক থেকে ডাউনলোড করে নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে চেন্নাই থেকে প্রথম দিন (২০ এপ্রিল) ইউএস বাংলার ফ্লাইটে ১৬৪ জন বাংলাদেশি ঢাকায় উড়ে যান। একইভাবে ২৪ এপ্রিল রাজধানী দিল্লি থেকেও ১৬৩ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। তাদের বিদায় জানাতে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান নিজে দিল্লি এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন।

২৫ এপ্রিলের মধ্যেই এভাবে চেন্নাই থেকে পাঁচটি ও দিল্লি থেকে একটি ফ্লাইটে মোট ৯৯৬ জন নাগরিককে বাংলাদেশ ফেরানো হয়। পরবর্তী এক সপ্তাহে আরও প্রায় পাঁচশ লোক দেশে ফিরেছেন। রবিবারও (৩ এপ্রিল) চলেছে মুম্বাই থেকে ঢাকার বিশেষ ফ্লাইট। কলকাতা ও দিল্লি থেকেও আরও ফ্লাইট চলেছে গত কয়েকদিনে।

চেন্নাই থেকে গত সপ্তাহে এমনই একটি ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন গাজীপুরের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। তিনি রওনা হওয়ার আগে বলেছেন, ‘এই কদিন অনেক কষ্ট হয়েছে। তারপরও যে দেশ আমাদের ফেরানোর একটা ব্যবস্থা করলো, তাতে আমি খুবই খুশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এতদিন শুনতাম শুধু বিলেত-আমেরিকাই নিজের লোকরা বিপদে পড়লে দেশে ফিরিয়ে নেয়। এখন বাংলাদেশও দেখিয়ে দিলো তারাও পারে। এই টিকিটের ভাড়া একটু কম হলে আরও ভালো হতো, কিন্তু কী আর করা!’

বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, টিকিটের ভাড়া কিছুটা কম রাখা গেলে যাত্রীদের অনেকটা সুবিধা হতো, কিন্তু এই বিষয়টা সরকারের হাতে ছিল না। তবে বিশাল এক ‘রিপ্যাট্রিয়েশন’ বা প্রত্যাবাসন কর্মকাণ্ডের প্রায় শতকরা আশিভাগ সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেলেছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.