বিমান চলাচল শুরু: ন্যূনতম ভাড়া যাত্রী অর্ধেক

দেশের অভ্যন্তরীণ পথে উড়োজাহাজে যাত্রার আগের দিন সিট পাওয়া একরকম সোনার হরিণ! আকাশযাত্রার অনেক আগেই টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় শেষ দিকে টিকিট কিনতে হয় চড়াদামে। কিন্তু করোনার কারণে চিরায়ত এই রীতি ভেঙে অভ্যন্তরীণ পথের টিকিট মিলছে ন্যূনতম ভাড়ায়। এমনকি আজ সোমবার থেকে শুরু হওয়া অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের টিকিট মিলেছে সর্বনিম্ন ভাড়ায়। বিমান সংস্থাগুলো বলছে, করোনাভাইরাসের কারণেই যাত্রী আকর্ষণে ন্যূনতম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করছে তারা। যাত্রীদের উড়োজাহাজমুখী করতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে বলে দাবি করেছে।

দীর্ঘ আড়াই মাসের বেশি বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় লোকসানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বিমান সংস্থাগুলো। এর মধ্যেই অভ্যন্তরীণ তিনটি পথে (ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট ও সৈয়দপুর) আজ থেকে দিনে ২৪টি করে ফ্লাইট চলবে। এর মধ্যে ১ জুন সকাল ৭টায় চট্টগ্রামে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস প্রথম ফ্লাইট দিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট শুরু হবে। ১৫ জুন পর্যন্ত তিনটি পথে ২৪টি ফ্লাইটের মধ্যে ইউএস-বাংলা চট্টগ্রামে ছয়টি, সৈয়দপুরে তিনটি ও সিলেটে একটি করে ফ্লাইট চালাবে। নভোএয়ারের প্রতিদিন চট্টগ্রামে তিনটি, সৈয়দপুরে তিনটি ও সিলেটে একটি করে ফ্লাইট রয়েছে। অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রতিদিন চট্টগ্রামে দুটি, সিলেটে দুটি ও সৈয়দপুরে তিনটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করবে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ পথে আমাদের এটিআর ৭২-৬০০ উড়োজাহাজে আসনসংখ্যা ৭২টি। কিন্তু সেখানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে যাত্রী নেওয়া যাবে প্রায় ৫০ শতাংশ। বর্তমান সময়ে আকাশপথে যাত্রী কমে যাওয়ায় ভাড়া সেভাবে বাড়ানো হয়নি।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভাড়া বাড়ানো হয়নি বলে জানান রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থাটির উপমহাব্যবস্থাপক তাহেরা খন্দকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের উড়োজাহাজগুলোতে ৭৪ আসনে ৩৫ জন যাত্রী নেওয়া হবে। তবে বিমানভাড়া আগের মতোই থাকবে। যেসব যাত্রী আগে টিকিট কাটবেন তাঁরা কম ভাড়া পাচ্ছেন। আর দেরিতে টিকিট কাটলে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি দামে টিকিট কিনতে হবে।’

চট্টগ্রামের ফ্লাইটে আড়াই হাজার টাকায় টিকিট মিলছে বলে জানালেন নভোএয়ারের সিনিয়র ম্যানেজার, মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস এ কে এম মাহফুজুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ফ্লাইট পরিচালনার সব প্রস্তুতি নিয়েছি।’

করোনা আতঙ্ক ও কড়াকড়িতে মানুষ উড়োজাহাজে উঠতে নিরুৎসাহিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক বোর্ড সদস্য ও এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম। তিনি বলেন, ‘কভিড-পরবর্তী পর্যায়ে প্যাসেঞ্জার মুভমেন্ট অনেক কমে যাবে। করপোরেট ও লেজার ট্রাভেল ব্যাপকভাবে কমবে। পর্যটনসংক্রান্ত ভ্রমণও অনেক কমবে। তাই যাত্রীদের আবার উড়োজাহাজমুখী করাই বড় চ্যালেঞ্জ।’

যাত্রী আকর্ষণে ভাড়া বাড়ানো হয়নি উল্লেখ করে এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবির) মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমানে এমনিতেই ভ্রমণের ক্ষেত্রে মানুষের মনে আতঙ্ক আছে। তার মধ্যে ভাড়া বাড়ানো হলে উড়োজাহাজ ভ্রমণে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই আমরা ভাড়া বাড়ায়নি। আগে মানুষের আস্থা ফিরে আসুক, মানুষ উড়োজাহাজে উঠুক। তারপর পরিস্থিতি ভালো হলে আমরা ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করব।’

এদিকে করোনাভাইরাসের মধ্যে বিমান চলাচলে ‘গাইডলাইন ফর এয়ার অপারেটরস অন প্রিভেন্টিং স্প্রেড অব কভিড-১৯ অন কমার্শিয়াল এয়ারক্রাফট’ শীর্ষক ৩৫টি নির্দেশনাসংবলিত আদেশ জারি করেছে বেবিচক। নতুন নির্দেশনায়, উড়োজাহাজে উঠে ইনফ্লাইট সেবাদানকারী কেবিন ক্রুদের পিপিই, গগলস, ফেসশিল্ড পরতে হবে। দেড় ঘণ্টার কম ফ্লাইটে দেওয়া হবে না খাবার। যাত্রীদেরও বাধ্যতামূলকভাবে পরতে হবে হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে প্লেনে উঠতে হবে, বসতে হবে পাশের সিট খালি রেখে। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশের বেশি সিটে যাত্রী নেওয়া যাবে না। প্রতি ফ্লাইট শেষে বিমান সংস্থাকে পুরো উড়োজাহাজ জীবাণুমুক্ত করতে হবে। বেবিচকের কাছ থেকে ফ্লাইট ছাড়ার আগে ‘সার্টিফিকেট অব ডিসইনফেকশন’ নিতে হবে, তারপর আরেকটি গন্তব্যে যেতে পারবে। প্রতি গন্তব্যের যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা, হেলথ ডিক্লারেশন ফরম পূরণ করতে হবে।

এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ-উল আহসান বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালনার সব প্রস্তুতি শেষ করেছি। সামাজিক দূরত্ব মেনে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জনবহুল স্থানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে ফুট মার্কিং করা, হাত পরিষ্কারের ব্যবস্থা, বিমানবন্দরে ঢোকার আগে ডিসইনফেকশন চেম্বার, থার্মাল চেক পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।’

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, ‘সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিমান চলাচল শুরু করতে চাই। আমরা ৩৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছি, সেই হিসেবে তাদের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এর ব্যত্যয় হলে ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমাদের ইন্সপেক্টররা এ বিষয়ে নজরদারি করবেন।’

 

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.