ঢাকা-জয়দেবপুর-ঢাকা রুটের বিমানবালাকে ধর্ষণ!

rape-at-airlinesএভিয়েশন নিউজ: কর্মজীবনে ২৭ভাগ বিমানবালা যৌণ হয়রানীর শিকার হন। হংকংভিত্তিক সংস্থা ইক্যুয়াল অপরচুনিটিজ কমিশন (ইওসি) তাদের এক পরিসংখ্যানে এই ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি ঢাকায় যে ঘটনাটি ঘটে সেটি ভিন্ন ধরনের। পেশাদার অপরাধীগ্রুপ এর সঙ্গে জড়িত ছিল। তাকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে ছেড়ে দেয় অপরাধীরা। মুক্তির পর বিমানবালার পরিবার পুলিশকে ঘটনাটি জানিয়েছে। বিমানবালার মায়ের তথ্য অনুযায়ী, তার মেয়েকে ছাড়িয়ে আনতে মুক্তিপণও দিতে হয় অপরহরণকারী গ্রুপকে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-জয়দেবপুর-ঢাকার সড়ক রুটে ১৬ ঘন্টার জন্য অপহরণ হন এক বিমানবালা। জীবিত ফেরত আসলেও সারাক্ষন মৃত্যুর ভয় তাড়া করে তাকে। অপহরণে কতজন ছিল এ বিষয়ে ওই বিমানবালা সঠিক তথ্য দিতে না পারলেও দীর্ঘ সময় অপহরণে কি হয়েছিল তার কিছু বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। এই বিমানকর্মীকে অপহরণের পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গাড়িতে তুলে নেয়ার পর চোঁখ বেঁধে রাখা হয়েছিল সারাক্ষণ। তারপর রাতে তাকে ছেড়ে দেয়।

অপহরণকারীরা বিমানবালাকে তুলে নেয়ার পর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি বাসায় তাকে বন্দী রাখে। আর এখানেই তাকে ধর্ষন করা হয়। মাত্র একবারের জন্য চোখ খুলে দেয়া হলে বিমানবালা দেখতে পান তাকে যে বাসার মধ্যে রাখা হয়েছে সেটি উপরে কোন ছাদ ছিল না। একটি নতুন নির্মানাধীণ বাসার চারিদিকে বিরাট দেয়াল আর উপরে খোলা রাখা দেখে তিনি কিছুটা আঁচ করতে পারেন যে এটি ঢাকা শহরের চিত্র নয়।

তবে প্রাইভেট কারের নিয়ে যাবার সময় তিনি বাইরে থেকে গাড়ির শব্দ শুনতে পান। বলেন, জয়দেবপুর যাবার জন্য লোকাল বাসের হেলপার চিৎকার করছে- ‘জয়দেবপুর জয়দেবপুর বলে’। তিনি পুলিশকে জানান, বাসার ভেতরে নেয়া হলে ঘন্টাখানেক পর তিনি বাথরুমে যাবেন জানালে অপহরণকারীরা তার চোখ খুলে দেয়। পরে চোখ খুলেই তিনি দেখতে পান নির্মানাধীন বাসাটি।

পুলিশ জানায়, গত ৫ এপ্রিল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বিমান বালা ‘ঈ’ ঢাকায় ধানমন্ডির ল্যাবএইডের সামনে গাড়ি থেকে নামেন। তারা দুইবোন মিলে অন্যবন্ধুদের সঙ্গে সিলেটে পিকনিক পার্টিতে গিয়েছিলেন। প্রায় পৌণে ৬টার দিকে তারা রিক্সাযোগে হাজারীবাগের মুধবাগের উদ্দেশ্যে রওয়া হন। কিন্তু ল্যাব এইড থেকে একটু সামনে অগ্রসর হলে একটি সাদা প্রাইভেটকার তাদের রিক্সার গতি থামায়।

চক্রের সদস্যরা নাটকীয় কায়দায় গাড়ি থেকে নেমে একবোনকে ধরে নিয়ে যায়। এ সময় বড় বোন ‘তা-ফা’ রিক্সা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়েন। পুলিশের ধারণা, অপহরণকারীরা ওঁতপেঁেত ছিল। তারা আগে থেকে জানতো বিমানবালা কখন আসবে এবং কোনপথ হয়ে আসছে। প্রযুক্তিগত তদন্ত চালিয়ে গোয়েন্দারা জানতে পারেন- অপহরণকারীরা অপেক্ষা করে সিলেট থেকে বিমান বালা কিছুক্ষণের মধ্যে এখানে নামবে।

তাই তারা গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত থাকে। সিলেট তাদের একজন সহযোগী আগেই জানিয়ে দেয়- কিভাবে বিমানবনকর্মী কোনপথ হয়ে কোনগাড়িতে ঢাকায় আসছে। ঠিক গাড়ি থেকে নামার পরপরই তাকে সাদা একটি প্রাইভেট কারে তুলে নেয়া হয়। চোখ বেঁেধ নিয়ে যাওয়া যাওয়া হয় অপরাধীরাদের আস্তানায়। বিমান বালার বড় বোন ‘তা-ফা’ যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যে থানা পুলিশকে বিষয়টি অবগত করি।

কিন্তু তারা কোন কুল কিনারা করতে পারে না। তবে গাড়িটি রং সাদা এবং কালো গ্লাস ছিল। গাড়ির প্লেট নম্বর ঝাপসা থাকায় তা দেখা যায়নি। অপহরণের পর ফিরে আসা বিমানবালা ‘ঈ’ জানান, ‘অপহরণকারীর তকে বেশিরভাগ সময় চোখ বেঁেধ রাখে। গাড়িতে তুলে নেয়ার পর তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে ‘ওর মোবাইল দিয়েই ওর বাসায় ফোন করতে হবে। বড় অংকের টাকা হলে রাতেই ছেড়ে দেয়া হবে। নইলে লাশ মিলবে নদীতে।’ তিনি আরও জানান, ‘তারা এও বলে আমাদের সবার মোবাইল বন্ধ আছে তো? পাশে থেকে একজন বলে- সিলেটের ফোন কলের পর সব মোবাইল বন্ধ করা আছে।’

‘ঈ’ তার ফিরে আসার ভয়ানক গল্প জানাতে গিয়ে কেঁেদ ফেলেন। বলেন, ‘আমি যখন গাড়িতে বসা তখন খুব ভয় হচ্ছিল। অপহরণকারীরা তাদের ফোন দিয়ে কোথাও কথা বলছে না। তবে তার ফোন দিয়েই তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে তারা ১০লাখ টাকা দাবি করে। একপর্যায় ওপাশ থেকে মা বলে যে- ‘আমার মেয়ের সঙ্গে আগে কথা বলিয়ে দাও। তখন তারা আমাকে আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য জন্য দেয়। এক মিনিট পরই তারা মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়।’

বিমানবালার তথ্য অনুযায়ী, অপহরণকারীরা তাকে জদেবপুরের ওই বাসা থেকে রাত প্রায় ৯টার দিকে ঢাকার দিকে রওয়ানা দেয়। এ সময়ও তার চোখ বাধা ছিল। ধারণা করে বিমানবালা বলেন, ঢাকার পথে আনার আগ পর্যন্ত তার চোখ বাঁধাই ছিল। আর চোখ বেঁেধ রাখা কাপড়টি একটি ছেড়া ওড়নার মতো লেগেছে। তবে চোখের ভেতরে আগে তুলা দিয়ে তারপর ওড়না দিয়ে বাঁধা হয়।’

তিনি আরও জানান, তারা (অপহরণকারীরা) নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে ‘ওর মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। রাতের মধ্যে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আমাদের আরেকটি টিম ধানমণ্ডি এলাকায় ‘ফখরুদ্দিন’ রেস্টুরেন্টের সামনে তাকে রেখে আসবে।’ অপহতার তথ্য অনুযায়ী, তাকে নিয়ে যাবার পর পুরো রাস্তায় দুই হাত ও চোখ বেঁেধ রাখা হয়। দুপুরে খাবার দেয়া হয়েছে।

বিকেলের নাস্তা এবং রাতে আসার পথে পানির পিপাসা লাগলে একটি পানির বোতল খুলে দেয় তারা। রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে ফখরুদ্দিনের সামনে একটি প্রাইভেট কার থেকে নামিয়ে দিয়ে সামনে যেতে বলা হয়। এ সময় কোনভাবেই যেন পেছন দিকে না তাকায় সে জন্য আগেই সতর্ক করা হয়। পেছনে তাকালে গুলি করা হবে- এ জন্য একটি অস্ত্র তার হাতে স্পর্শ করে বোঝানো হয়। তাকে নামিয়ে দেয়ার পর গাড়িটি দ্রুত গতিতে চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান এই বিমানকর্মী।

এদিকে ঘটনার দিন বিমানবালার মা বাদী হয়ে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরই শুরু হয় গোয়েন্দা তৎপরতা। পুলিশ বলছে, এ ঘটনার পেশাদার অপহরণকারীচক্র করেছে। তাদের একটি সিন্ডিকেট রাজধানী ঢাকা, অন্যাটি, দিনাজপুর এবং আরেকটি গাজীপুর এলাকায় থাকে। এরমধ্যে ঢাকার টিম গাড়ি তুলে নিয়ে যায়, গাজীপুরের টিম তাদের অপারেশনাল হেড কোয়ার্টারে রাখে এবং দিনাজপুরের টিম অর্থ লেনদেন করে থাকে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমণ্ডি থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) খান মো: জুবায়ের বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত রেজাউল আলম নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই সময় বিমানকর্মীর মোবাইল সেটটি তার কাছ থেকেই উদ্ধার হয়েছে। প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা গেছে- সেটটি ঘটনার পরদিনও প্রায় আধাঘন্টা ব্যবহার করেছে রেজাউল। সেটটিতে অন্য একটি সিম ব্যবহার করা হয়েছিল। যার অবস্থান ছিল রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকা।

তদন্ত সূত্র জানায়, রেজাউলের সঙ্গে পেশাদার অপহরণকারীদের সখ্যতা দীর্ঘ দিনের। তবে এ ঘটনায় বিমানবালার কোন বন্ধু জড়িত থাকতে পারে।’ বিমানকর্মী ফিরে আসার বিষয়ে তার মা যুগান্তরকে বলেন, মেয়েটি অবিবাহিত হওয়ায় তিনি কিছু বলতে পারবেন না। তবে কিছু মুক্তিপণ দিয়ে তার মেয়েকে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু কত টাকা লেগেছে এ বিষয়ে তিনি মুখ খুলতে চাননি। বিমানবালা এপ্রিলে ওই ঘটনার পর থেকে সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.