চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ড্রোন চুক্তি, ভারত কেন উদ্বিগ্ন
চীনের সহযোগিতায় দেশে ড্রোন বা মানববিহীন আকাশযান তৈরির কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।
চীনের সহযোগিতায় দেশে ড্রোন বা মানববিহীন আকাশযান তৈরির কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এই প্রকল্পকে প্রতিরক্ষা খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি চীনা প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নয়াদিল্লিতে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত প্রতিযোগিতায় এই উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদর দপ্তরে এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়। এর আওতায় চীনের সহযোগিতায় দেশে ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপন, সংযোজন এবং ধাপে ধাপে প্রযুক্তি হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী।
প্রাথমিক পর্যায়ে মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘ সময় উড়তে সক্ষম এবং খাড়াভাবে ওঠানামা করতে পারে—এমন দুই ধরনের ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। সামরিক নজরদারির পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তার কাজেও এসব ড্রোন ব্যবহারের কথা রয়েছে। কারখানাটি বগুড়া বিমানঘাঁটিতে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫৭০ কোটি টাকা কারখানা স্থাপন ও প্রযুক্তি আমদানিতে ব্যয় হবে। চারটি অর্থবছরে ধাপে ধাপে অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান সিইটিসি ইন্টারন্যাশনাল এ প্রকল্পে সহযোগিতা করছে। প্রতিষ্ঠানটি রাডার, যোগাযোগব্যবস্থা, ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে।
বাংলাদেশের জন্য এ উদ্যোগের বড় সুবিধা হলো, শুধু বিদেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিবর্তে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ভারতের উদ্বেগের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। ভারতীয় বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে সক্ষম ড্রোন সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ব্যবহার করা হতে পারে। চীনা প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। তবে এসব আশঙ্কা যে বাস্তবে ঘটেছে, এমন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে চীনের প্রভাব আগে থেকেই রয়েছে। নৌবাহিনীর বিভিন্ন সরঞ্জাম, সাবমেরিন ও রাডার ব্যবস্থায় চীনা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ড্রোন কারখানার উদ্যোগকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আরও বিস্তৃত রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের কাছে প্রকল্পটি প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি অর্জনের সুযোগ। অন্যদিকে, ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে এটি নয়াদিল্লির কৌশলগত হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রকল্পটির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ড্রোনের সক্ষমতা, ব্যবহারের নীতি এবং বাংলাদেশ কীভাবে প্রযুক্তি ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তার ওপর।