বাংলাদেশ বিমানের জন্য খোঁজা হচ্ছে নতুন এমডি

বাংলাদেশ বিমানের জন্য খোঁজা হচ্ছে নতুন এমডি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের শীর্ষ পদে পরিবর্তন আসছে। টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতি ও লোকসানে লাগাম টানতে না পারায় মেয়াদ আর বাড়ানো হচ্ছে না ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোসাদ্দিক আহমেদের। তাঁর জায়গায় এবার নতুন এমডি ও সিইও খুঁজছে রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইনসটি। একই সঙ্গে নতুন সৃষ্টি করা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং নির্বাহী পরিচালক পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে সংস্থাটি। তবে জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসটির শীর্ষ পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে স্নাতক ডিগ্রি। এ নিয়ে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বিশেষ কাউকে নেওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তরের পরিবর্তে স্নাতক চাওয়া হয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এমডি পদের জন্য আবেদনকারীর বয়স ৪৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে। স্নাতক পাসের সঙ্গে থাকতে হবে এভিয়েশন খাতে পরিচালক পদে ১০ বছরসহ ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশি কিংবা বিদেশি এমনকি বিমানের কর্মকর্তাদের যে কেউ এই পদের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন আগামী ১৫ এপ্রিল। এদিকে ডিএমডি পদে শুধু বাংলাদেশিরা আবেদন করতে পারবেন। বিজ্ঞপ্তিতে এমডি ও ডিএমডির বেতনের ব্যাপারে প্রত্যাশিত অঙ্ক উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।

বিমানের বর্তমান এমডি ও সিইও এ এম মোসাদ্দিক আহমেদের তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৩০ মে। ২০১৫ সালে বিমানের পরিচালক পদ থেকে অবসরে যান মোসাদ্দিক আহমেদ। সে সময় তিনি বিমানের ভারপ্রাপ্ত এমডি ও প্রধান নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৮৩ সালে বিমানে সহকারী ম্যানেজার পদে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ মার্চ প্রথম এমডি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের নাগরিক কেভিন স্টিল। ২০১৪ সালের শুরুতে স্টিল পদত্যাগ করলে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় যুক্তরাজ্যের কেইল হেইউডকে। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে স্টিলের মতোই এক বছরের মাথায় তা ছেড়ে দেন তিনি। বিভিন্ন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিলেও অভ্যন্তরীণ নানা সিন্ডিকেটের কারণে কেইলও চলে যেতে বাধ্য হন।

বিমান বাংলাদেশের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মোমেন গতকাল বুধবার বলেন, ‘স্নাতক পাস যোগ্যতা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, কাউকে ঠিক করে রাখা হয়েছে কি না। বিমান কর্তৃপক্ষ সঠিক ও যোগ্য লোককে নেবে কি না সেটাই প্রশ্ন। যখন কেভিন স্টিলকে নেওয়া হয়েছিল, তখন আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে নেওয়ার বিরুদ্ধে ছিলাম, কারণ তিনি কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি মার্কেটিংয়ে ভালো ছিলেন, কিন্তু তিনি জিএম ছিলেন। একজন জিএমকে কিভাবে এমডি করা হলো?’ তিনি বলেন, ‘বিএ, এমএ পাস যাঁকেই নেওয়া হোক বিমানে কাজ করতে হলে তাঁকে দক্ষ, পেশাদার ও সাহসী হতে হবে। মিলিটারি এভিয়েশন নয়, সিভিল এভিয়েশনে সফল লোক হতে হবে।’

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘পেশাদার ব্যক্তি হতেই হবে এবং তাঁর মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। বিমান যেহেতু ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান, এ জন্য ব্যাবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে বিমানকে কেউ ওঠাতে পারবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিমানের জন্য সচিবালয় থেকে, বিমানবাহিনী এমনকি বিদেশ থেকে লোকজন আনছি। শুধু ভালো পাইলট কিংবা ভালো ইঞ্জিনিয়ার হলেই চলবে না, অবশ্যই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা সফল করার যোগ্যতা থাকতে হবে। বিশ্বের বড় এয়ারলাইনসগুলো তা-ই করছে।’ বিমানের এমডি পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক ডিগ্রি চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা কেন চাওয়া হয়েছে, এর পেছনে কী আছে এটা কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। বিমানকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে এই নিয়োগেই তার প্রমাণ দিতে হবে।’

দুর্নীতি-অনিয়মে নিমজ্জিত থাকার কারণে দেশের পর্যটনের বিকাশে বিমান ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে জানান বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের গভর্নিং বডির সদস্য জামিউল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বিমানের বিষয়টি খুবই জটিল। তাই পুরো কাঠামো ঢেলে না সাজালে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। যারা লুটপাটের সাথে অতীতে জড়িত ছিল এবং বর্তমানে আছে তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সাথে সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো প্রশাসনিক কাঠামো ও বিপণনসহ সার্বিক নীতি নির্ধারণ করে আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যেখানে প্রায় সবাই লুটপাটে জড়িত সেখানে দু-চারজন সরিয়ে নিয়ে কিছুই হবে না। তবে সরকার চাইলে বিমানকে ঠিক করা এমন কোনো ব্যাপার নয়। এ জন্য প্রথমেই নতুন নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।’

বিমানে কর্মী নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি পাইলট নিয়োগ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ আছে, বিশেষ প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে তিনবার বিজ্ঞপ্তি পরিবর্তন করা হয়। নানা উপায়ে দুর্বল প্রার্থীকেও পাস করানো হয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সিপিএলধারীদের (কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স) সঙ্গে বিশেষ এয়ারক্রাফট পরিচালনায় অভিজ্ঞ প্রার্থীর যোগ্যতা এক করে ফেলায় এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যদিও বিমান কর্তৃপক্ষ বলেছে, প্রার্থীরা নিজ যোগ্যতা ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করেছেন। বিমানের এবারের সার্কুলারে কিছু ভুল ছিল, এ কারণে সংশোধন করা হয়েছে।

কালের কণ্ঠ

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.