চট্টগ্রাম বন্দরে এপ্রিলে পণ্য ওঠানামা কমেছে ৪৭ শতাংশ

দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে করোনাভাইরাসের প্রভাবে মোট পণ্য ওঠানামায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। মার্চ মাসে প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়লেও সেই মাসে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। কিন্তু বড় ধাক্কাটা এসেছে এপ্রিল মাসে। আর মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে পণ্য ওঠানামা কমেছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। মার্চ মাসে পণ্য উঠানামা হয়েছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার একক। এপ্রিলে তাতে ধস নেমে এক লাখ ৩২ হাজার এককে নেমেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে একমাসে এত কম পণ্য ওঠানামা বিগত ১০ বছরে হয়নি।

বন্দরের পণ্য ওঠানামার এই হিসাবে, আমদানি পণ্যভর্তি, রপ্তানি পণ্যভর্তি এবং খালি কন্টেইনারও যুক্ত আছে। আর চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল এবং কমলাপুর আইসিডির পণ্য ওঠানামার হিসাবে যুক্ত আছে। শুধু আমদানি-রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার সংখ্যা হিসাব করলে পণ্য ওঠানামার হার আরো অনেক কমবে।

যদিও বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, করোনাভাইরাসের চেয়ে জাহাজ জটের কারণে মূলত এই ধস নেমেছে। কারণ করোনাভাইরাসের কারণে রপ্তানিতে ধস নামবে কিন্তু আমদানি এত কমে যাওয়ার কারণ দেখি না।

উল্লেখ্য, দেশের মোট আমদানির ৮২ শতাংশ আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এবং মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশ হয়ে থাকে এই বন্দর দিয়ে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য আসা-যাওয়ার ওপর দেশের অর্থনীতি কতটা গতিশীল তার একটা ধারনা পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ পরিচালনাকারী বিদেশি কম্পানির তথ্য মতে, মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে শুধুমাত্র আমদানি-রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার এসেছে ১ লাখ ৭২ হাজার একক। আর এপ্রিলে তা কমে ৮৩ হাজার এককে নেমেছে। মার্চের তুলনায় এপ্রিলে আমদানি কমেছে ৩৭ শতাংশ; আর রপ্তানি কমেছে ৭৯ শতাংশ।

জানতে চাইলে বিদেশি জাহাজ পরিচালনাকারী ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস লাইনের দেশিয় এজেন্ট জিবিএক্স’র অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনতাসির রুবাইয়াত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে পণ্য আসা-যাওয়ার বড় ধস নেমেছে এটা বলা যাবে না। করোনার কারণে আমরা জাহাজ শিডিউল বাতিল করিনি; জাহাজ যথারীতি পণ্য নিয়ে এসেছে কিন্তু জটের কারণে বহির্নোঙরে আটকা পড়েছে। এপ্রিলে একটি জাহাজকে ১২ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। জেটিতেও থাকতে হয়েছে ৫ থেকে ৬ দিন। ফলে পণ্য এসেছে কিন্তু বন্দরে নামতে পারেনি বলে হ্যান্ডলিয় কম হয়েছে।’

তিনি মনে করেন, পণ্য ওঠানামা সচল করতে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হতে থাকলে মে মাসে পণ্য ওঠানামা অনেক বাড়বে।

বিদেশি জাহাজ পরিচালনকারী মেডিটেরানিয়ান শিপিং কম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপক আজমীর হোসাইনও বলছেন, আমদানি পণ্য এসেছে ঠিকই কিন্তু কন্টেইনার ও জাহাজজটের কারণে নামতে পারেনি। মার্চে আমদানি পণ্য নেমেছে ১ লাখ ১০ হাজার একক কিন্তু এপ্রিলে নেমেছে ৭০ হাজার একক; বাকি পণ্য কিন্তু সাগরে জাহাজে ভাসমান আছে। তবে করোনার কারণে রপ্তানিতে কিছু প্রভাব পড়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এপ্রিলে যেটা হয়েছে সেরকম ধ্বস নামেনি। তিনিও আশা করেন এখন যে গতিতে জাহাজ থেকে পণ্য নামছে সেটি অব্যাহত থাকলে মে মাসে আমদানি ও রপ্তানি দুটোই এপ্রিলের চেয়ে অনেক বেশি বাড়বে।

জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটির পর থেকে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ডেলিভারি বা ছাড় কমতে থাকে। বন্দরে কন্টেইনার রাখা যায় ৪৯ হাজার একক কিন্তু পণ্য ছাড় কমে যাওয়ায় ধারন ক্ষমতা চাড়িয়ে যায়। বন্দর কর্তৃপক্ষ কন্টেইনার অফডকে সরিয়ে নেওয়া, পণ্য রাখার স্টোররেন্ট ছাড়সহ নানা উদ্যোগের ফলে এখন কন্টেইনার জট কমতে শুরু করেছে। কিন্তু এখনও স্বাভাবিক হয়নি।

জানতে চাইলে বন্দর চেয়ারম্যান রিযার এডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার কারণে নয় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ছুটির ফাঁদে পড়ে বন্দরে জাহাজ ও কন্টেইনার জট হয়েছে। এর ফলে এপ্রিলে পণ্য উঠানামা কমেছে। আমরা বন্দরকে পূর্ণসচল করতে আভ্যন্তরীণ ও বাইরের বিভিন্ন সংস্থার সাথে মিলে যে উদ্যোগ নিয়েছি সেগুলো বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় জট কিছুটা কমেছে। আমরা নিয়মিত রাত-দিন তদারকি করছি জট কমাতে। আশা করছি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’

জানা গেছে, দেশের প্রথম করোনাভাইরাস রোগী ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ। কিন্তু মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামায় কোনো প্রভাব পড়েনি; বরঞ্চ ফেব্রুয়ারি মাসের চেয়ে বেশি পণ্য ওঠানামা হয়েছে মার্চে। মার্চে আমদানি ও রপ্তানি মিলিয়ে বন্দরে প্রায় আড়াই লাখ একক কন্টেইনার ওঠানামা হয়েছে। আর এপ্রিল মাসে পণ্য উঠানামা কমে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার এককে নেমেছে। অর্থ্যাৎ মার্চের তুলনায় এপ্রিলে পণ্য উঠানামা কমেছে প্রায় ৪৭ শতাংশ; মানে এর আগের মাসের চেয়ে অর্ধেক!

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিমাসে আড়াই লাখ এমনকি প্রায় তিন লাখ এককও কন্টেইনার উঠানামার রেকর্ড রয়েছে। এপ্রিলে রপ্তানির পরিমাণ ছিল সাড়ে ৫৮ হাজার একক কন্টেইনার; আর আমদানির পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার ৮০০ একক কন্টেইনার। মার্চ মাসে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার একক; রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার একক। সর্বশেষ এপ্রিল মাসে জাহাজ আসাও ধস নেমেছে। মার্চে বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়েছিল ১২৪টি আর এপ্রিলে ভিড়েছে মাত্র ৮৪টি।

Comments (0)
Add Comment