বাজেট পাসের আগে অতিরিক্ত শুল্ক আদায় করায় তোপের মুখে অপারেটরা

এভিয়েশন নিউজ রিপোর্ট : বাজেট পাসের আগে মোবাইলে কথা বলা ও ইন্টারনেটে বাড়তি শুল্ক নেয়ায় সরকারের তোপের মুখে পড়েছে মোবাইল ফোন অপারেটরা। এই ঘটনায় কেন বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে তা জানতে চেয়ে ইতিমধ্যে মোবাইল অপারেটরদের কড়া ভাষায় ই-মেইল পাঠিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

মেইলে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বাজেটে যে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো কথা বলা হয়েছে অপারেটররা তা ইতিমধ্যেই আরোপ করা শুরু করেছে। বিষয়টি বিটিআরসির নজরে এসেছে। এটা প্রমাণিত হলে নজিরবিহীন কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাতিল করা হতে পারে সব ধরনের অনাপত্তিপত্র (এনওসি)। সব সেবা ও ট্যারিফ অনুমোদনও বন্ধ করে দেয়া হতে পারে।

বিটিআরসির জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফারহান আলম শনিবার অপারেটরদের এই ই-মেইল পাঠান বলে জানা গেছে। ই-মেইলে বিটিআরসি আরও বলেছে, বাজেটে মোবাইল সেবার ওপর যে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, তা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়ার কথা।

তবে সংশ্লিস্টরা বলেছেন, জাতীয় সংসদে যেদিন বাজেট ঘোষণা হয় সেদিন থেকেই নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। অর্থবিলের ৮৮ পাতায় কোন কোন দফা অবিলম্বে কার্যকর হবে তা উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে। এর আওতায় ৮০ নম্বর দফাও আছে। এই দফার অন্তর্ভুক্ত মোবাইল সেবা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ গণমাধ্যমকে বলেন, সম্পূরক শুল্ক ও অন্যান্য শুল্ক আরোপ করা হলে সেটা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়। তা না হলে অপব্যবহার করার সুযোগ থাকে। যেমন বাজেটে গাড়ির ওপর যদি বাজেট ঘোষণাকালে শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয় আর কার্যকর হয় জুলাই থেকে তাহলে আগে গাড়ি আমদানি করে রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আরও বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক কার্যকর করার এই রীতি ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে। তবে আমরা মাঝে দুই বছর বাদ দিয়েছিলাম। পরে আবার আগের রীতিতে ফেরত যাওয়া হয়।’

বাজেটে সরকার মোবাইল সেবা, ইন্টারনেট ব্যবহার ও খুদে বার্তা পাঠানোর ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন। রাতেই কোনো কোনো অপারেটর তা কার্যকর করার কথা জানায়। কেউ কেউ কার্যকর করলেও গ্রাহকের জন্য সব ক্ষেত্রে দাম বাড়ায়নি।

নতুন করহারে মোবাইল সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ১৫ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশ ও সারচার্জ ১ শতাংশ। ফলে মোট করভার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর অর্থ প্রতি ১০০ টাকা রিচার্জে সরকারের কাছে কর হিসেবে যাবে ২৫ টাকার কিছু বেশি। এত দিন ছিল ২২ টাকার মতো। বিশ্লেষকেরা এবং কোম্পানিগুলো বলে আসছিল, মোবাইল সেবায় কর বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষ চাপে পড়বে।

মোবাইল সেবার ওপর কর প্রায় প্রতিবছরই বাড়ানো হচ্ছে। এনবিআর ও মোবাইল অপারেটরদের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোবাইল সেবার ওপর ১ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আরোপ হয় ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ও ৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। আর চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক আরও বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

শীর্ষ দুই মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবির হিসাবে তাদের মোট রাজস্ব আয়ের ৫৩ থেকে ৫৬ শতাংশই সরকারের কোষাগারে বিভিন্ন কর ও ফি বা মাশুল হিসেবে চলে যায়। দেশে মার্চ শেষে মোবাইল গ্রাহক দাড়িয়েছে ১৬ কোটি ৫৩ লাখের বেশি। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, মোবাইল সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক বসানো ঠিক নয়। কারণ, এ ধরনের কর সাধারণ মানুষের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটব (এসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফরহাদ (অবঃ) বাজেট প্রকাশের দিন বলেছেন, নিয়মিতভাবে করের বোঝা চাপিয়ে সরকার মোবাইল খাতকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে। গ্রাহকদের উপর তৈরী করছে বাড়তি চাপ।

এমটব মহাসচিব বলেন, দেশের অর্থনীতিতে মোবাইল টেলিকম খাতের অবদান যত উল্লেখযোগ্যই হোক না কেন, সরকার নিয়মিতভাবে প্রতিবছর এই খাতের উপর আরও বেশি করে করের বোঝা চাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশের জিডিপিতে মোবাইলের বর্তমান অবদান ৭ শতাংশ থেকে যে দুই অংকের ঘরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল তা আর অর্জিত না-ও হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এমনিতেই মানুষদের মধ্যে যখন নাভিশ্বাস উঠেছে, মোবাইল মাধ্যম হয়ে উঠেছে সব যোগাযোগের মূল চালিকা ও দেশ ডিজিটাল ইকনোমির দিকে এগিয়ে চলছে; ঠিক সে সময় এ ধরনের করের বোঝা কোনভাবেই দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না। এ বোঝা দরিদ্র মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে পড়বে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে উঠবে যা করোনাভাইরাস সঙ্কটের কারণে আরও বাড়বে। এতে মোবাইল শিল্প খাত আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হবে।

মোবাইল ফোন অপারেটর রবির চীপ করপোরেট এন্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম এক বিবৃতিতে বলেছেন, টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর আরোপিত ২ শতাংশ ন্যূনতম আয় কর প্রস্তাবিত বাজেটে প্রত্যাহার না হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

উচ্চ করভারে জর্জরিত মোবাইল সেবার ওপর তাই নতুন করে আরো ৫ শতাংশ এসডি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের দুর্দশা আরও বাড়াবে। করোনা মহামারির বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ এখন ইন্টারনেটভিত্তিক ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, এসডি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত এ ধারাতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

Comments (0)
Add Comment