থমকে গেছে বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, ফাইলবন্দি শত সংস্কার কাজ!

নিরাপত্তা ও ফ্লাইট পরিচালনায় শঙ্কা

বিমানবন্দর উন্নয়ন থমকে, ফাইলবন্দি শত সংস্কার কাজ, বরাদ্দ সংকটের অজুহাতে আটকে যাচ্ছে প্রকল্প, অচল যন্ত্রপাতি বদল হচ্ছে না; নিরাপত্তা ও ফ্লাইট পরিচালনায় শঙ্কা

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর উন্নয়ন, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে অস্বাভাবিক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন বিমানবন্দরের জরুরি সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শত শত ফাইল মাসের পর মাস অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কোনো উন্নয়ন বা সংস্কার কাজের ফাইল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের টেবিলে পৌঁছালেই তা বরাদ্দ সংকটের অজুহাতে আটকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিমানবন্দরগুলোর দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে দেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তাদের ভাষ্য, বিমানবন্দরগুলোতে একের পর এক সমস্যা জমা হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন)-এর শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বারবার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হলেও সেগুলোর অনেকগুলোরই দৃশ্যমান সমাধান হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর রানওয়ে পরিষ্কার রাখার জন্য ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সুইপার মেশিনগুলোর কয়েকটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় রয়েছে। বিমানবন্দর সূত্রের দাবি, এসব যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন বা নতুন মেশিন ক্রয়ের জন্য একাধিকবার চাহিদাপত্র এবং আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হলেও বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।

একাধিক সূত্র জানায়, রানওয়ে সুইপার মেশিন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উড্ডয়ন ও অবতরণের আগে রানওয়ে থেকে ধুলাবালি, পাথরের কণা, ধাতব টুকরা এবং অন্যান্য বিদেশি বস্তু (Foreign Object Debris-FOD) অপসারণে এসব যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী রানওয়ে পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রানওয়েতে পড়ে থাকা ছোট কোনো ধাতব টুকরাও উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বা চাকার ক্ষতির কারণ হতে পারে।

একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহের জন্য বারবার লিখিতভাবে জানিয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ও সীমিত সক্ষমতার যন্ত্রপাতি দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে।”

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যখন দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তখন অন্যান্য বিমানবন্দরের অবস্থা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিভিন্ন বিমানবন্দরে রানওয়ে সংস্কার, ট্যাক্সিওয়ে উন্নয়ন, এপ্রন মেরামত, টার্মিনাল ভবনের যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন, নিরাপত্তা অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম উন্নয়নের মতো অসংখ্য কাজ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু বরাদ্দ সংকট কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজ এগোচ্ছে না।

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রকৌশল বিভাগগুলোর কাজও কমে গেছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী দিনের পর দিন প্রকৃত কারিগরি কাজের পরিবর্তে অফিসে বসে সময় পার করছেন। মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রকল্প ও সংস্কার কার্যক্রম না থাকায় অনেক বিভাগে কার্যত স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

একজন সাবেক বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ বলেন, “বিমানবন্দর পরিচালনা একটি অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরাপত্তা সংবেদনশীল কাজ। এখানে অবহেলা বা বিলম্বের সুযোগ নেই। আজ যে সংস্কার কাজটি স্থগিত রাখা হচ্ছে, কাল সেটিই বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিমানবন্দরগুলোর নিজস্ব আয় থেকেও অনেক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। যাত্রীসেবা চার্জ, অবতরণ ও পার্কিং ফি, কার্গো হ্যান্ডলিং, বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়। কিন্তু সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের অভিযোগ, বিমানবন্দরগুলোর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জবাবদিহিতা এবং তদারকির ঘাটতি রয়েছে। অনেকের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একটি অংশ কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দর কোনো সাধারণ সরকারি স্থাপনা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু বিমানবন্দরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো এভিয়েশন খাত ও দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তারা বলছেন, ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়, বিমানবন্দরগুলোর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশের বিমান চলাচল খাতকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে। নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সময়মতো সমাধান না হলে একসময় তা ফ্লাইট পরিচালনা, যাত্রীসেবা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুতর সংকট তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

Comments (0)
Add Comment