বিমান পরিবহন ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের নেতৃত্বাধীন এক সদস্যের ট্রুথ কমিশন গতকাল মঙ্গলবার সকালে তদন্তে নেমেছে। দুপুরে কমিশন প্রধান আরেক সহকারীসহ কুর্মিটোলায় বিমানের প্রধান কার্যালয়ে যান। তিনি সোনা চোরাচালান বিষয়ে বিমানের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। গত ২৩ নভেম্বর গঠিত এ কমিশনের ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিমান কর্মকর্তা বলেন, সোনা চোরাচালানের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্তের কোনো প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা এ কমিশনের নেই। তাই শেষ পর্যন্ত ট্রুথ কমিশনের তদন্তে আদৌ কোনো সত্য উদ্ঘাটিত হবে কি না সন্দেহ।
তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের বক্তব্য ভিন্ন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, সোনা চোরাচালান ছাড়াও উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েই কমিশন কাজ করবে। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে সুপারিশ পাঠাবে। আর মন্ত্রণালয় সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে। বিমানমন্ত্রী আরো বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে শুধু সোনা চোরাচালানের বিষয়টি পুলিশই তদন্ত করছে।
ভিন্ন একটি সূত্র মতে, মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলো থেকে সোনা নিয়ে আসতে গেলে যেহেতু সে দেশের শুল্ক বিভাগের ছাড়পত্র প্রয়োজন, তাই সরকারি তদন্ত সংস্থাগুলোর উচিত হবে সে সব দেশের শুল্ক বিভাগের সহায়তা নিয়ে বিমানের নির্দিষ্ট ফ্লাইটের কোন কোন যাত্রী কবে কী পরিমাণ সোনা দেশে এনেছেন, তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা।
এ জন্য প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এটি উভয় দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক আলোচনাসাপেক্ষে এগিয়ে নিতে পারে। কারণ, এর সঙ্গে বিমানের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সুনাম জড়িত। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল শ্রমবাজার থাকায় বাংলাদেশ এ বিষয়ে নীরব থাকার পন্থাই নিয়েছে। তাই আশঙ্কা রয়েছে, চলমান পুলিশি তদন্তে নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের চোরাকারবারি ধরা পড়লেও বরাবরের মতো অধরা থেকে যাবে মাফিয়া ডনরা। আর বিমান ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ (বেবিচক) পুরো সিন্ডিকেট রয়ে যাবে অন্তরালেই।
এদিকে সোনা চোরাচালানের বিষয়ে বেবিচকের কিছু করণীয় রয়েছে কি না তা জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা বলেন, বেবিচক শুধু যাত্রী ও ফ্লাইট চলাচল তথা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দেখভাল করে। সোনা চোরাচালানের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই বলে বেবিচকের তেমন কিছু করার নেই। সোনাসহ সব ধরনের পণ্য চোরাচালানের বিষয়টি দেখে প্রধানত শুল্ক ও পুলিশ বিভাগ।
গত ১৮ নভেম্বর রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদ হোসেন, ফ্লাইট ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মাদ আসলাম শহীদ, শিডিউল ইনচার্জ তোজাম্মেল হোসেন, বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশ এবং উত্তরার ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক হারুন অর রশিদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ১২ নভেম্বর বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে সোনা উদ্ধারের পর মাজহারুল আফসার নামের একজন কেবিন ক্রুকে আটক করা হয়।
তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরেই আটক করা হয় বিমানের ডিজিএমসহ ওই পাঁচজনকে। এদের মধ্যে ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশ বিমানের চেয়ারম্যানের ‘ধর্মপুত্র’ বলে পরিচিত। অন্তত বছর তিনেক ধরে এই চক্রটি ঢাকার শাহজালাল ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবাধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল বলে অভিযোগ আছে।
বিমানের ডিজিএমসহ পাঁচজন রবিবার আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে চোরাচালানের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দুজন ক্যাপ্টেন ও জিএমের নাম বলেছেন। আর একই দিন বিমান চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করে বিরোধীদলীয় ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে প্রতীকী ওয়াক আউট করেন। আগের দিনই বিমান পরিচালনা পর্ষদের সভায়ও চেয়ারম্যান জামাল পড়েন প্রশ্নবাণে।