লন্ডন–ঢাকা রুটে বিমানের কার্গো বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে

বছরের শত কোটি টাকা লোকসান!

লন্ডন–ঢাকা রুটে বিমানের কার্গো বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখল
অভ্যন্তরীণ তদন্তে স্বীকারোক্তি; স্বেচ্ছাচারি ও ভুল সিদ্ধান্তে বছরে শত শত কোটি টাকা লোকসান

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডন–ঢাকা রুটের কার্গো ব্যবসা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। একসময়ের এই লাভজনক রুটটি এখন বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে চলে যাওয়ায় বিমানকে বছরে শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিমা‌নের জরুরি সভার কার্যবিবরণী এবং বিপণন বিভাগের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

অভিযোগ আছে প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা,  একটি অসাধু চক্রের ষড়যন্ত্র, তৎকালীন আওয়ামীলী‌গের একজন প্রভাবশালী প্রেসি‌ডিয়াম মেম্বা‌রের হস্ত‌ক্ষে‌পে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির কার্গো প্রতিষ্ঠান জেএমজি কার্গো অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেডকে কার্গো সেলস এজেন্ট থেকে বাদ দেওয়ার পরেই এই বিপর্যয় নেমে আসে।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩-এর জরুরি সভার কার্যবিবরণী যা বলছে:
আমা‌দের হা‌তে আসা কার্যবিবরণীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো:
তৎকালীন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিমের সভাপতিত্বে সভায় জানানো হয়, ২০০৯ সাল থেকে টানা জেএমজি কার্গো বিমানের সঙ্গে সফলভাবে ব্যবসা করে আসছিল। এই ব্যবসা থেকে বিমান বছরে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা লাভ করত। কিন্তু জেএমজিকে বাদ দেওয়ার পর লন্ডনের কার্গো শূন্যে নেমে আসে।

আইনি প্রক্রিয়ায় চুক্তি ও অনুমোদন : নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে জেএমজি কার্গোর ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর ও ২০১৪ সালে ১৮ অক্টোবর পৃথক পৃথক কার্গো সেলস এজেন্ট এগ্রিমেন্ট ও লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক প্রণোদনা চুক্তি সম্পাদিত হয়।

যৌক্তিক কারণ ছাড়াই চুক্তি বাতিল : বিমানের লন্ডন অফিসের তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খান অসাধু চক্রের প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে জেএমজি কার্গোকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছিলেন। এই চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রে মানা হয় নি কোনো নিয়ম নীতি, দেওয়া হয় নি কোন সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা। অভিযোগ আছে এই চক্রটি জেএমজিকে শুধু কার্গো থেকেই বাদ দেয়নি তাদের মোটা অংকের  বকেয়া টাকাও দিচ্ছে না।

চুক্তি বাতিলের আগে জেএমজি কার্গো বিমানের প্রতি ফ্লাইটে প্রায় ৮ টন কার্গো দিলেও কোন কারণ না দেখিয়ে তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খান তা হঠাৎ কমিয়ে ৩ টনে নামিয়ে আনেন। তখন থেকেই কমতে থাকে এই রুটে বিমানের কার্গো পরিবহনের হার। বর্তমানে বিমানের  অধিকাংশ ফ্লাইটে লন্ডন থেকে কোন কার্গোই আসে না। জানা গেছে লন্ডনের এই কার্যগুলো এখন বিদেশি এয়ারলাইন্স গুলো পরিবহন করছে।

বিপণন বিভাগের প্রতিবেদন ও রাজস্ব ধসের চিত্র :
গত ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন স্বাক্ষরিত বিমানের বিপণন বিভাগের প্রতি‌বেদন অনুসারে এবং সভার কার্যবিবরণীর অন্যান্য অংশ বিশ্লেষণে জেএমজি’র পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি পরিলক্ষিত হয় । সেখানে উঠে আসে একটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে কীভাবে করা হয় ষড়যন্ত্র। এতে বলা হয়, জেএমজি কার্গোর সঙ্গে  বাংলাদেশ বিমানের সিএসএ চুক্তি বাতিলের পর লন্ডন-ঢাকা রুটে বিমান তার কার্গো বাজার হারায়, একই সাথে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি ।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লন্ডন-ঢাকা রুটে কার্গো থেকে বিমানের আয় ছিল ৪৭.৪৪কোটি টাকা, যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি আসে জেএমজি কার্গো থেকে। ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জেএমজি কার্গোর চুক্তি বাতিলের পর ২০২০-২১ অর্থবছরে বিমানের আয় নেমে আসে মাত্র ৫.৯৩ কোটি টাকায়।

ওই সভায় বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিপুল রাজস্ব ক্ষতির জন্য জেএমজির মতো এজেন্টের চুক্তি বাতিল করায় দায়ী কর্মকর্তাদের তিরস্কার করার পাশাপাশি জেএমজি কার্গোকে পুর্নবহালের তাগিদ দেন।

ষড়যন্ত্রকারী অসাধু চক্র:
তদন্ত ও সভার তথ্য বিশ্লেষণে জেএমজি কার্গোর বিপক্ষে ষড়যন্ত্রে জড়িত কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে:
বিমানের লন্ডন অফিসের তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খান ২০২০ সালের ৩ আগস্ট জেএমজির চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান। একই সাথে তৎকালীন ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার আবু সাইদ মোঃ মঞ্জুর ইমাম ২০২০ সালে ঢাকা থেকে লন্ডনে আসা দুই সদস্যের তদন্ত দলের নেতৃত্ব দেন।

ষড়যন্ত্রকারী অসাধু চক্র:
তদন্ত ও সভার তথ্য বিশ্লেষণে জেএমজি কার্গোর বিপক্ষে ষড়যন্ত্রে জড়িত কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে:
বিমানের লন্ডন অফিসের তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খান ২০২০ সালের ৩ আগস্ট জেএমজির চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান। একই সাথে তৎকালীন ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার আবু সাইদ মোঃ মঞ্জুর ইমাম ২০২০ সালে ঢাকা থেকে লন্ডনে আসা দুই সদস্যের তদন্ত দলের নেতৃত্ব দেন।

অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা লন্ডনে গেলেও জেএমজি কার্গোর সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ না করে ঢাকা ফিরে এসে নীতিবহির্ভূতভাবে মনগড়া একতরফা মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করেন।

পক্ষপাতদুষ্ট এই অসাধু চক্র সেই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে। এই চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং বর্তমান সরকারের আমলেও তারা তাদের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

জেএমজি কার্গোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনির আহমেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, “আমরা প্রবাসীদের কাছে বিমানের সেবা পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছি। আমাদের বাদ দেওয়ার পর লন্ডন-ঢাকা রুটে পণ্য পাঠাতে প্রবাসীরা বাধ্য হয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্স বেছে নিচ্ছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমরা চাই, বিমান বাংলাদেশ আমাদের পুনর্বহাল করে এই রুটের কার্গো আয় পূর্বের মতো ফিরিয়ে আনুক।”

তিনি আরো অভিযোগ করেন, জেএমজিকে বাদ দেবার পর গত পাঁচ বছরে বিমান কর্তৃপক্ষ সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো সুরাহা বা সুবিচার পাননি। এখন দেশে দীর্ঘদিন পরে নির্বাচিত সরকার আসায় সুবিচার পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।

আমাদের হাতে আসা বিমানের দুটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুসারে, জেএমজিকে বাদ দেওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিমানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০০-৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে এই রাজস্ব ক্ষতির হার ছাড়িয়ে গেছে ৬০০ কোটিরও বেশি।

তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিম দ্রুত জেএমজিকে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনার তাগিদ দিলেও, তার বদলি হওয়ার পর প্রক্রিয়ায় গড়িমসি শুরু হয়। বিমানের অভ্যন্তরীণ পৃথক প্রস্তাবনা ও প্রতিবেদন গত দুই বছরেও অদৃশ্য কারণে কার্যকর হয়নি।

তবে, ২০২৪ সালে বিমানের লন্ডন অফিস নতুন করে জেএমজি কার্গোকে এজেন্ট নিয়োগের জন্য অযৌক্তিক শর্ত জুড়ে দিয়ে ই-মেইল পাঠালেও পরে পূর্বের শর্ত অনুযায়ী পুনর্বহালের প্রক্রিয়ায় গড়িমসি শুরু করে।

অন্তবর্তী সরকারের আমলেও বিমান ও পর্যটন উপদেষ্টা বরাবরে লিখিত আবেদন করা হলেও কোনো সুরাহা মেলেনি।
জেএমজি কার্গোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের ফলে লন্ডন–ঢাকা রুটে বিমানের কার্গো ব্যবসা সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে।

এর ফলে শুধু বাংলাদেশের রাজস্বে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে না, পাশাপাশি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটি তাদের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য কার্গো সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরণের স্বেচ্ছাচারী ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রবাসী সম্প্রদায়ের আস্থা ও স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

Comments (0)
Add Comment