হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ার চালুর পর দেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচল থেকে আদায় হওয়া ‘ওভারফ্লাইট চার্জ’ বা আকাশপথ ব্যবহার ফি-তে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই এই খাত থেকে প্রায় ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা আয় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিমানবন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, নতুন কন্ট্রোল টাওয়ার এবং অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তি চালুর ফলে এখন বাংলাদেশের প্রায় পুরো আকাশসীমা কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। অতীতে দেশের কিছু আকাশসীমা, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা, পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ছিল। ফলে কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের গতিবিধি পুরোপুরি নজরদারির আওতায় আনা কঠিন ছিল এবং নির্ধারিত ওভারফ্লাইট ফি আদায়ে ঘাটতি দেখা দিত।
নতুন প্রযুক্তি চালুর পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এখন উন্নত রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে শত শত নটিক্যাল মাইল দূরের উড়োজাহাজও রিয়েল-টাইমে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। এর ফলে আকাশসীমা ব্যবহারকারী প্রতিটি বিদেশি উড়োজাহাজকে সঠিকভাবে শনাক্ত করে নির্ধারিত ফি আদায় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ওভারফ্লাইট চার্জ থেকে আয় হয়েছিল ১৫৭ কোটির বেশি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৪ কোটিরও বেশি। আর ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এই আয় প্রায় ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। মাসভিত্তিক হিসাবেও জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ—প্রতিটি মাসে আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বিশেষ করে জানুয়ারি মাসে দুই বছরের ব্যবধানে অতিরিক্ত আয় হয়েছে ২৬ কোটিরও বেশি টাকা।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এটিসি টাওয়ার চালুর ফলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। প্রথমত, দেশের আকাশসীমার পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ফ্লাইট ট্র্যাকিং, যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং নির্ভুলতা বেড়েছে। তৃতীয়ত, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক কন্ট্রোল টাওয়ার ও রাডার স্থাপন প্রকল্পটি প্রথমে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকার হিসেবে পরিকল্পনা করা হলেও পরবর্তীতে ব্যয় বেড়ে ৯৪২ কোটিতে পৌঁছায়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে। কারণ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে একদিকে যেমন নিরাপত্তা জোরদার হয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয়ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কন্ট্রোল টাওয়ার শুধু বিমান চলাচল ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রতীক নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিমান খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অর্জন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সক্ষমতা ও অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।