২০২৮ সালের আগে চালু হচ্ছে না ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট
উড়োজাহাজ সংকট, বহর সম্প্রসারণে দীর্ঘসূত্রতা ও লিজিং পরিকল্পনায় অপেক্ষা আরও অন্তত দুই বছর
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা আরও পিছিয়ে গেছে। সরকারের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। উড়োজাহাজ সংকট, নতুন বিমান সরবরাহে বিলম্ব এবং বহর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সিভিল এভিয়েশন মাস্টার প্ল্যানিং ওভারভিউ’ শীর্ষক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিমানের বহরে নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত হতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে। ফলে নিউইয়র্ক রুট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি হতে আরও সময় লাগবে।
বহর সংকটই বড় বাধা
বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দীর্ঘদিন ধরেই উড়োজাহাজ সংকটে ভুগছে। সরকার ইতোমধ্যে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স। এসব উড়োজাহাজ পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা হবে। বিশেষ করে ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপগামী দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বৈশ্বিকভাবে বোয়িংয়ের উৎপাদন ও সরবরাহ জটিলতার কারণে নতুন বিমান হাতে পেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ফলে নিউইয়র্ক রুট চালুর পরিকল্পনাও পিছিয়ে যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে এয়ারবাস লিজ
মন্ত্রী জানান, নতুন উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। এর মাধ্যমে বিদ্যমান রুটগুলোর চাপ কমানো এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এতে এ৩৫০-৯০০ ও এ৩২১নিও উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বহর সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে লিজিংই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ নিউইয়র্ক রুট?
বাংলাদেশি প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট। বর্তমানে যাত্রীদের মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা অন্য কোনো ট্রানজিট বিমানবন্দর হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হয়। সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে যাত্রাসময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি উপকৃত হবেন।
তবে শুধু উড়োজাহাজ থাকলেই এই রুট চালু সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA)-এর বিভিন্ন নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত মানদণ্ড পূরণ, পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং লাভজনক অপারেশনাল পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
প্রথমবারের মতো জাতীয় বিমান চলাচল মহাপরিকল্পনা
এদিকে কর্মশালায় দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সমন্বিত জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল মহাপরিকল্পনা (Civil Aviation Master Plan) প্রণয়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনায় বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, নতুন আন্তর্জাতিক গেটওয়ে, এয়ার নেভিগেশন আধুনিকীকরণ, নিরাপত্তা জোরদার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সরকারের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচল হাবে পরিণত করা। ইতোমধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, আধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা এবং নতুন আন্তর্জাতিক সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বিমান খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন উড়োজাহাজের প্রাপ্যতা। নতুন ড্রিমলাইনার হাতে পাওয়ার আগে রুটটি চালু করা কঠিন হবে। তবে লিজিং পরিকল্পনা সফল হলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করা গেলে ২০২৮ সালের পর এই বহু প্রতীক্ষিত রুট বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
তাদের মতে, নিউইয়র্ক রুট শুধু একটি নতুন গন্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সক্ষমতা ও বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।