প্রায় এক দশক ধরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল্যবান অ্যাপ্রোন এলাকা দখল করে পড়ে থাকা ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ অবশেষে ভাঙারি (স্ক্র্যাপ) হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ২৬ মে উড়োজাহাজগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়। বর্তমানে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামের অনুমোদন চেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
বেবিচক সূত্র জানায়, পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৮টি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ২টি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের ১টি এবং অ্যাঞ্জেল এয়ারওয়েজের ১টি রয়েছে। এগুলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো অ্যাপ্রোনে প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দখল করে আছে, যা বিমানবন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল এলাকা।
এই অ্যাপ্রোন থেকেই কার্গো কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং উড়োজাহাজ পার্কিং করা হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত বিমান পড়ে থাকায় নিয়মিত ও অনিয়মিত ফ্লাইটের পার্কিংয়ে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্য পরিবহন ও কার্গো পরিচালনায় চাপ বাড়ছে এবং বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মূল্যবান জায়গা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বেবিচক জানায়, উড়োজাহাজগুলোর উড্ডয়নযোগ্যতার সনদের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে যায় এবং পরে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার উড়োজাহাজ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করাসহ সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়।
তবে বাজেয়াপ্ত করার পরও বিক্রি সহজ হয়নি। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উড়োজাহাজের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণে সক্ষম কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান দেশে নেই। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়ন করাতে যে ব্যয় হবে, তা সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণেই ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের প্রস্তাব দিয়েছে বেবিচক।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা উড়োজাহাজগুলো এখন মূলত স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে। এগুলো বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাই মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিললে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং নির্বাচিত ক্রেতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দর এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
বিমান খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ্রোন দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত উড়োজাহাজে দখল হয়ে থাকা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। দ্রুত স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক নিলামের মাধ্যমে এসব উড়োজাহাজ অপসারণ করা গেলে কার্গো কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে, পার্কিং সক্ষমতা বাড়বে এবং বিমানবন্দরের মূল্যবান অবকাঠামো আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।