ঢাকা: মদিনা থেকে ঢাকায় আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে যাত্রী হয়রানি, বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহার না করা, জমজমের পানির কন্টেইনার নির্ধারিত সময়ে যাত্রীদের কাছে পৌঁছাতে না পারা এবং দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মীর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটির প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অপারেশনাল রেকর্ড পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
জানা যায়, গত ১ অক্টোবর মদিনা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে ২৭২ জন যাত্রী ছিলেন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন ওমরাহযাত্রী। ফ্লাইটটিতে বিরোধী দলের ৩৪ জন এমপিসহ মোট ৫৪ জন ভিআইপি মর্যাদার যাত্রী ছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকার বিমানবন্দরে মোট আটটি বোর্ডিং ব্রিজ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে ব্যবহার করা হচ্ছিল না। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন বাকি ছয়টি বোর্ডিং ব্রিজ সচল ছিল। ফ্লাইটটির নির্ধারিত আগমনের সময় ছিল সকাল ৮টা ৫৫ মিনিট। অভিযোগ রয়েছে, এর পরবর্তী এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত ৪ ও ৮ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজ অব্যবহৃত থাকার পরও মদিনা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক ওমরাহযাত্রী ও ভিআইপি যাত্রী বহনকারী ফ্লাইটটিকে বোর্ডিং ব্রিজের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি।
আরও জানা যায়, ফ্লাইটটি থার্ড টার্মিনালের ব্রাভো-১৪ নম্বর বে-তে পার্কিং করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু কেন কার্যকর বোর্ডিং ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও ফ্লাইটটির যাত্রীদের বোর্ডিং ব্রিজ সুবিধা দেওয়া হয়নি—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জমজমের পানি নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জমজমের পানির কন্টেইনার। অভিযোগ অনুযায়ী, উক্ত ফ্লাইটের ব্যাগেজ বেল্টের ইনচার্জ হিসেবে বিমান শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার সহযোগী হিসেবে সাদ্দাম হোসেনও দায়িত্ব পালন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাখাওয়াত ফ্লাইটটির LDM (Load Distribution Message) আগেই গ্রহণ করেছিলেন। ওই নথিতে ফ্লাইটের ব্যাগেজ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকার কথা।
অভিযোগ রয়েছে, সাখাওয়াত ও সাদ্দাম ব্যাগেজ আপলোডের সময় সরেজমিনে উপস্থিত থাকলে জমজমের পানির কন্টেইনারটি আপলোড না হয়ে ফেরত যাওয়ার ঘটনা ঘটত না। এতে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা যদি সরাসরি উপস্থিত না থেকে ট্রাফিক হেলপারদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে থাকেন, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ভিআইপি প্রটোকল নিয়েও প্রশ্ন
ভিআইপি যাত্রী বহনকারী ফ্লাইটে সাধারণত প্রিমিয়াম সার্ভিস ও ভিআইপি প্রটোকল নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ ও সিনিয়র কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই ফ্লাইটে প্রিমিয়াম সার্ভিসের দায়িত্বে জসিম উদ্দিন, ওরফে ‘বস্তা জসিম’, সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবস্থাপনা এবং ভিআইপি যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সার্ভিস নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তার বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ডিউটি রেকর্ডও যাচাই করা জরুরি।
সিসিটিভি ফুটেজেই মিলতে পারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সময়ের বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে মদিনা ফ্লাইটের আগমনের পর থেকে ব্যাগেজ ডেলিভারি পর্যন্ত সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মীরা কোথায় ছিলেন, কে কোন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জমজমের পানির কন্টেইনারটি প্রায় আড়াই ঘণ্টা কোথায় ছিল—এসব তথ্য সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে সহজেই যাচাই করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, জমজমের পানির কন্টেইনার দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার পরও ব্যাগেজ এরিয়ার সিসিটিভি ফুটেজ যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি। কেন তা করা হয়নি, সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত।
দুই কর্মী সাময়িক বরখাস্ত, উঠছে নতুন প্রশ্ন
ঘটনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের একজন সাখাওয়াত। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আসেননি।
অন্যদিকে মনিরুল, যিনি ফরেন ক্যারিয়ার—ইন্ডিগো ও সৌদিয়ার মতো এয়ারলাইন্সের ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলেন বলে জানা গেছে, তিনি কেন এই ঘটনায় রোষানলের শিকার হলেন—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটিও প্রকাশ করা এবং তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
ওই দিন বিমানের স্টেশন ম্যানেজার হিসেবে জাহিদ দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে জানা গেছে। পুরো ঘটনায় স্টেশন ম্যানেজমেন্টের ভূমিকা কী ছিল এবং ঘটনাটি মোকাবিলায় কী ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন
চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, ওই ফ্লাইটে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীদের মধ্যে অনেকেই বিমান শ্রমিক লীগের সক্রিয় নেতা, কর্মী বা ডোনার হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে কোনো কর্মীর রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয়কে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে, প্রত্যেকের নির্দিষ্ট দায়িত্ব, উপস্থিতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঘটনায় ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
ঘটনাটি যদি কারও অবহেলা, ভুল ব্যবস্থাপনা বা ইচ্ছাকৃত গাফিলতির কারণে ঘটে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আবার রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয়ের কারণে যদি কোনো কর্মী অন্যায়ভাবে শাস্তির শিকার হয়ে থাকেন, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো অপচেষ্টা ছিল কি?
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—এ ধরনের অব্যবস্থাপনা বা উদাসীনতা কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল?
বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক ওমরাহযাত্রী ও ভিআইপি যাত্রী বহনকারী একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে বোর্ডিং ব্রিজ, ব্যাগেজ ও জমজমের পানির ব্যবস্থাপনায় একাধিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো অপচেষ্টা ছিল কি না—এমন কোনো অভিযোগের সত্যতা থাকলে তারও প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান করা দরকার।
দীর্ঘদিনের ব্যাগেজ ট্রলি সংকট
ঢাকা বিমানবন্দরে ব্যাগেজ ট্রলির সংকট দীর্ঘদিনের বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর বিমানবন্দরে এসে পর্যাপ্ত ট্রলি না পাওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, মদিনা থেকে আসা ফ্লাইটটি যদি বোর্ডিং ব্রিজের সঙ্গে সংযুক্ত করা হতো, তাহলে যাত্রীদের চলাচল ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের কিছু সমস্যা এড়ানো সম্ভব হতে পারত। তবে এ দাবির সত্যতা নির্ধারণে ওই দিনের অপারেশনাল রেকর্ড ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সময়ের দাবি
একজন যাত্রী দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে নিজ দেশের বিমানবন্দরে এসে হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হবেন—এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। একইভাবে দায়িত্ব পালনকালে কোনো বিমানকর্মীও যেন অন্যায়ভাবে অপমান, হয়রানি বা শাস্তির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
তাই ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহারের রেকর্ড, ফ্লাইটের LDM, ব্যাগেজ লোডিং ও আনলোডিং রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ডিউটি রোস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ, স্টেশন ম্যানেজমেন্টের নির্দেশনা এবং সাময়িক বরখাস্তের কারণ পর্যালোচনা করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।