বিশেষ প্রতিনিধি : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডনগামী একটি ফ্লাইটে যাত্রীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দায়িত্ব পালনে তিনজন পার্সারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা হলেন—চিফ পার্সার পারিসা, সিনিয়র/ফ্লাইট পার্সার আবির ফিরুজ এবং জুনিয়র পার্সার রোমা।
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট তিন পার্সারসহ মোট ১২ জন কেবিন ক্রুকে বিশেষ প্রশিক্ষণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও একজন প্রভাবশালী পার্সার সেই প্রশিক্ষণে অংশ নেননি। তিনি হলেন সিনিয়র পার্সার আবির ফিরুজ, যিনি ওই ফ্লাইটের ইকোনমি ক্লাসের দায়িত্বে ছিলেন বলে জানা গেছে।
বিমান সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিজি-২০১ ফ্লাইটটি সিলেট থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ফ্লাইটটি ইতালির আকাশসীমায় প্রায় ৪৩ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থানকালে ইকোনমি ক্লাসের দুই যাত্রী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন যাত্রী ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
ককপিটকে জানানো হয়েছিল কি?
এভিয়েশন সংশ্লিষ্টদের মতে, উড়োজাহাজের অভ্যন্তরে যাত্রীদের মধ্যে গুরুতর সংঘর্ষ কেবিন সেফটির দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে কেবিন ক্রুর দায়িত্ব হলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নির্ধারিত সেফটি ও ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং প্রটোকল অনুসরণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পাইলট ইন কমান্ডকে অবহিত করা।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বিজি-২০১ ফ্লাইটের কমান্ড পাইলট ক্যাপ্টেন সাজেদুলকে সংঘর্ষের বিষয়ে যথাসময়ে অবহিত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট পার্সাররা বিষয়টি নিজেদের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করেন এবং ঘটনাটিকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুতর একটি ঘটনা সম্পর্কে ককপিট ক্রুকে যথাসময়ে জানানো হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট সেফটি ও ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
একাধিক সেফটি প্রটোকল নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আরও কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—ককপিট ক্রুকে যথাসময়ে অবহিত না করা, প্রয়োজনীয় এয়ার সেফটি বা সেফটি রিপোর্ট না করা, প্যাসেঞ্জার ওয়ার্নিং ফর্ম না দেওয়া, ঘটনার সাক্ষী বা উইটনেস সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট ফ্লাইট সার্ভিস কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করার মতো অভিযোগ।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়োজাহাজে যাত্রীদের মধ্যে সংঘর্ষের মতো ঘটনা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে কেবিন ক্রুদের পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং সেফটি প্রটোকল অনুসরণের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১২ কেবিন ক্রুকে বিশেষ প্রশিক্ষণের সিদ্ধান্ত
বিমান সূত্রের দাবি, বিজি-২০১ ফ্লাইটের ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট তিন পার্সারসহ মোট ১২ জন কেবিন ক্রুকে পাঁচ দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।
তবে অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সিনিয়র পার্সার আবির ফিরুজ ওই বিশেষ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তিনি কেবিন ক্রু ইউনিয়নের সভাপতি এবং বিমান স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে প্রশিক্ষণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত থেকে নিজের নাম বাদ দিয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।বিষয়টি নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রভাব নয়, সেফটি আগে
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কর্মকর্তা যতই প্রভাবশালী হোন না কেন, বিমান নিরাপত্তা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নিয়ম থাকা উচিত।
বিশেষ করে কোনো ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ যদি সংশ্লিষ্ট কেবিন ক্রুদের পুনঃপ্রশিক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ব্যক্তির পদমর্যাদা, সাংগঠনিক অবস্থান কিংবা প্রভাব বিবেচনা করে কাউকে প্রশিক্ষণের বাইরে রাখা উচিত নয়। যদি তদন্তে দায়িত্ব পালনে ঘাটতি বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষণ কোনো শাস্তি নয়; বরং এটি যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তাই চিফ পার্সার থেকে জুনিয়র কেবিন ক্রু—যার যে ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা উচিত।
বিশেষ করে কোনো পার্সার যদি কেবিন ক্রুদের নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকেন, তাহলে তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি পেশাগত দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং সেফটি প্রটোকল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান প্রত্যাশিত।
‘যত বড় প্রভাবশালীই হোন, প্রশিক্ষণ থেকে অব্যাহতি নয়’
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বিজি-২০১ ফ্লাইটের ঘটনায় যদি সংশ্লিষ্ট কোনো পার্সারের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি প্রমাণিত হয়, তাহলে তিনি যত বড় প্রভাবশালী কর্মকর্তা বা সাংগঠনিক পদে থাকুন না কেন, তাঁকে প্রশিক্ষণের বাইরে রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তাঁদের মতে, বিমান নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রভাবের চেয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেফটি প্রটোকল গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বিজি-২০১ ফ্লাইটের ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, কার দায়িত্বে কোথায় ঘাটতি ছিল, ককপিটকে যথাসময়ে জানানো হয়েছিল কি না এবং ১২ জন কেবিন ক্রুকে প্রশিক্ষণে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর একজন পার্সার কীভাবে সেই প্রশিক্ষণের বাইরে থাকলেন—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তদন্তে কোনো ধরনের পেশাগত দুর্বলতা বা প্রশিক্ষণ ঘাটতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পার্সারদের রিফ্রেশার, লিডারশিপ এবং পার্সার-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করা উচিত।