হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন সোনা চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই বিমানবন্দরে সোনার বড় চালান আটক হলেও বন্ধ হচ্ছে না চোরাচালান। চলতি সপ্তাহেও টানা কয়েকদিন অভিযান চালিয়ে সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, মাত্র চার মাসের ব্যবধানে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৭০ কোটি টাকার সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে জব্দ হয়েছে প্রায় দুই হাজার কেজি সোনা।
চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কাস্টমসের নজর এড়াতে প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে। ফলের ক্যারেট, বিমানের টয়লেট, যাত্রীর শরীর, লাগেজ কিংবা বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে সোনা আনার ঘটনা ধরা পড়েছে। কখনো যাত্রীকে, আবার কখনো বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মীদেরও বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ল্যাপটপের ব্যাটারি, ট্রলির হাতল, মানিব্যাগ, জুতা, শার্টের কলার, হুইলচেয়ার ও বিভিন্ন সরঞ্জামের ভেতরেও সোনা লুকানোর নজির রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সোনা চোরাচালানের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই অন্যতম প্রধান উৎস। পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকেও নিয়মিত চালান আসছে। চক্রগুলো বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে বাংলাদেশে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে চালান গ্রহণ ও বিতরণ করে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বিমানবন্দরের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মীর সহযোগিতা ছাড়া এত বড় চালান নিয়মিত প্রবেশ করা কঠিন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাতেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ৩ অক্টোবর বিমানবন্দরে পৃথক তিনটি অভিযানে প্রায় ৭৮১ গ্রাম সোনার অলংকারসহ সাতজনকে আটক করে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। এর পরদিন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই কর্মীকে প্রায় ৯ কেজি সোনার ৮০টি বারসহ আটক করা হয়। এর আগে ২ জুলাই একটি উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম সোনা উদ্ধার করা হয়। ১৯ জুলাই ফলের চালানের আড়ালে ১৬ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনাও ঘটে।
এছাড়া গত ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা একটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম সোনার বার উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সম্পৃক্ততার বিষয়ও তদন্তে এসেছে।
ঢাকা কাস্টমস হাউস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সোনা উদ্ধারের পর বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসও নজরদারির আওতায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাহক আটক করে সোনা চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর পেছনের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে হবে। কার্গো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও কাস্টমস বিভাগের সমন্বিত নজরদারি, আধুনিক স্ক্যানিং, ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি ও রোটেশন প্রয়োজন। এপিবিএন জানিয়েছে, সোনা ও মাদকসহ সব ধরনের চোরাচালান ঠেকাতে অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।