রুট সংকটের কারনে সুযোগ নিচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো

আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে আকাশপথে যাত্রী বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসের সংখ্যাও। অথচ প্রতিযোগিতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে বিদেশি সংস্থগুলো। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সরকারি এয়ারলাইনসের তুলনায় বহরে নতুন ও আধুনিক উড়োজাহাজ থাকার পরও কেবল অব্যস্থাপনা ও নিম্নমানের সেবার কারণে বেহাল হয়ে পড়ছে বিমান। এমনকি দেশি বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোও অনেক ক্ষেত্রে বিমানের চেয়ে এগিয়ে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের ভেতর ও আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রীর সংখ্যা ২০০৮ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২০১৫ সালে ছিল ২৯ লাখ ছয় হাজার ৭৯৯। মালামাল পরিবহনও এ সময়ে বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। যাত্রীর চাপ থাকলেও মাত্র ১৫টি আন্তর্জাতিক ও সাতটি অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করছে বিমানের হাতে গোনা কয়েকটি ফ্লাইট। আর এই সুযোগে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো ফ্লাইট বাড়িয়ে দিয়েছে। বিমানের উড়োজাহাজবহরে আছে চারটি নতুন বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, দুটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর, চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ইআর ও দুটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ। এর পরও বিদেশি সংস্থাগুলোর সঙ্গে পেরে উঠছে না সংস্থাটি। এ অবস্থা কাটাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি রুটের সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, বিমানকে টিকিয়ে রাখতে হলে রুট বাড়াতেই হবে। আর এর জন্য আরো উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা জরুরি।

এ প্রসঙ্গে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, ‘২০১৮ ও ২০১৯ সালে যোগ হবে আরো সর্বাধুনিক নতুন দুটি বোয়িং ৭৮৭, যা বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে অন্য এক উচ্চতায়। রুট বাড়ানোরও চেষ্টা চলছে। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে এ পরিস্থিতি কেটে যাবে। ’

তবে রুট বাড়ানোর ক্ষেত্রে সমস্যাও আছে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিমানে যেসব পাইলট চাকরি করেন, তাঁরা ওভারটাইম করতে আগ্রহী নন। অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয় ওভারটাইমের বদলে তাঁরা সে সময়টায় বেসরকারি বিমান চালান। বেসরকারি এয়ারলাইনসে তিন থেকে চার ঘণ্টা ডিউটি করলে পাঁচ থেকে ছয় হাজার ডলার আয় হয়। আর বাংলাদেশ বিমানে একই সময়ের ডিউটিতে পাওয়া যায় এক থেকে দেড় হাজার ডলার। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটিকে পাইলট সংকটে ভুগতে হয়।

আর এর সুযোগ নিচ্ছে বিদেশি সংস্থাগুলো। বর্তমানে বাংলাদেশে এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস লি., এয়ার এশিয়া, ব্যাংকক এয়ারওয়েজ, চায়না সাউদার্ন, ড্রাগন এয়ারওয়েজ, ড্রুক এয়ার, এমিরেটস, ফ্লাই দুবাই, জেট, কুয়েত, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস, মিহিন লঙ্কা, পাকিস্তান এয়ারলাইনস, কাতার, সৌদি অ্যারাবিয়ান, সিঙ্গাপুর, থাই, মালিন্দো, টাইগার, মালদিভিয়ান, চায়না ইস্টার্ন, ইতিহাদ, রোটানা জেট এয়ার, এয়ার আরাবিয়া ও টার্কিশ এয়ারলাইনস প্রতিদিনই ফ্লাইট চালাচ্ছে সারা বিশ্বে শতাধিক রুটে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিমান সাতটি অভ্যন্তরীণ রুট ও মাত্র ১৫টি আন্তর্জাতিক রুটে অপারেট করছে। তার মধ্যে রিয়াদে সপ্তাহে ছয়টি, জেদ্দায় সাত, দাম্মামে তিন, কুয়েতে তিন, মাস্কাটে সাত, আবুধাবিতে সাত, দুবাইয়ে সাত, দোহায় তিন, কুয়ালালামপুরে ১১, সিঙ্গাপুরে সাত, ব্যাংককে সাত, ইয়াঙ্গুনে তিন, কলকাতায় ১৪, কাঠমাণ্ডুতে সাত ও লন্ডনে চারটি ফ্লাইট চলাচল করেছে। তবে মাসখানেক আগে ফ্লাইটের সংখ্যা কুয়ালালামপুরে ১৩ ও কলকাতায় ১৬টিতে উন্নীত করা হয়েছে বলে জানান বিমানের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ। তিনি জানান, সম্প্রতি এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, চার রুটে আরো ১৫টি ফ্লাইট বাড়ানো হবে। আন্তর্জাতিক রুটে মালয়েশিয়া, ভারত আর অভ্যন্তরীণ রুটে চট্টগ্রামে তিনটির বদলে ১৩ ও সৈয়দপুরে ছয়টির বদলে সাতটি করে ফ্লাইট চলবে।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশ বিমান অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বোয়া) অভিষেক অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও বিমান চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এনামুল বারী সংস্থাটির কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সমালোচনা করেন।

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ বিমান চালু করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো বিমানের সেই অর্জিত গৌরব এখন আর নেই। সংস্থাটি সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক পারসেপশন দূর করতেই হবে। বিমান একটি কম্পানি। অথচ পরিচালিত হয় করপোরেট পদ্ধতিতে। ’

এনামুল বারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘বিমান নিয়ে এত বদনামে আমি খুব লজ্জা পাই। আপনারা কেন পান না? বিমানের সেবা নেই, জবাবদিহিতা নেই—মানুষের মনে এসব প্রশ্ন কেন তৈরি হবে। যাত্রী ও কার্গো সেবার মান বাড়াতে হবে। নইলে বিমানের কোনো উন্নতি হবে না। ’

বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো বছরে নিয়ে যায় ১৭ হাজার কোটি টাকা : বাংলাদেশ বিমানের রুট কম হওয়ায় সুবিধা লুটছে বিদেশি সংস্থাগুলো। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করে তারা বছরে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এয়ারলাইনস ব্যবসার ৮০ শতাংশই বর্তমানে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর দখলে। এক দশক আগেও এ খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল দেশীয় বিমান সংস্থার। কিন্তু গত ছয়-সাত বছরে ওই চিত্র পাল্টে গেছে। নানা কারণে দিন দিন ছোট হয়ে এসেছে দেশি এয়ারলাইনস ব্যবসার পরিধি। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ইউনাইটেড, জিএমজি ও বেস্ট এয়ারলাইনসের ফ্লাইট।

বিমানের এক কর্মকর্তা জানান, সিভিল এভিয়েশন নিরাপত্তার কথা বলে বিমানসহ দেশি সংস্থাগুলোকে ২০ বছরের বেশি বয়সী উড়োজাহাজ ভাড়া করার অনুমতি দিচ্ছে না। যার ফলে রুটের সংখ্যা কমে আসছে। বিদেশি সংস্থাগুলো এর সুযোগ নেবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি আরো জানান, অন্তত দুটি বিমান ভাড়া অথবা কিনতে পারলে বছরে কমপক্ষে দুই শ কোটি টাকারও বেশি আয় করা সম্ভব। ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের আকাশপথে চলাচলের জন্য ৪৭টি দেশের এয়ারলাইনসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশনের। এ কারণে তারা আকাশপথে বেশি লাভবান হচ্ছে। আর আমাদের বিমান বছরে আয় করে তিন শ থেকে সাড়ে তিন শ কোটি টাকা।

আয় কমছে বিমানের : বিমান সূত্র জানায়, ২০১৪-২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে বিমানের লাভ কমেছে ৪৮ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরে যাত্রী পরিবহন বেড়েছে। এই সময়ে বিমান রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৩১০ কোটি টাকা রাজস্ব জমা দিয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিমান ৩২৪ কোটি টাকা লাভ করে। গত অর্থবছরে তা ২৭৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অবশ্য ২০০৭ সালে বিমান কম্পানিতে রূপান্তর হওয়ার পর ২০০৭ ও ২০০৮ সালে পর পর দুবার লাভের মুখ দেখে। এরপর আবার লোকসানে পড়ে সংস্থাটি।

অবশেষে খাবারের মান বাড়ছে বিমানের : অবশেষে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক রুটে সেবার মান বাড়ানোর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বিমান। গত ২৩ মার্চ খাবার তালিকায় পরিবর্তনসহ আন্তর্জাতিক রুটে নতুন আঙ্গিকের ইনফ্লাইট সার্ভিস চালুর ঘোষণা দিয়েছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহমেদ। প্রথমে লন্ডন রুটে নন-স্টপ ফ্লাইটে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের সমমানের ‘এ লা কার্ট’ মেন্যু ও ‘অল ডে ডিনার’ চালু হবে, যা ক্রমে অন্যান্য রুটেও যুক্ত হবে। কর্মকর্তারা জানান, বিমানের ফুড ক্যাটারিং সেন্টার বিএফসিসি বর্তমানে দৈনিক সাড়ে আট হাজার খাবার সরবরাহ করে। হজের সময় এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজারে। খাবারের মান ভালো হওয়ায় বিমান ছাড়াও চারটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস বিএফসিসি থেকে নিয়মিত খাবার নেয়। আরো ১৪টি বিদেশি এয়ারলাইনস তাদের ক্যাজুয়াল মিল নেয় বিএফসিসি থেকে।

সূত্রঃ দৈনিক কালের কণ্ঠ

Comments (0)
Add Comment