বিমানে স্বর্ণ পাচার, জড়িত শত শত কর্মী

স্বর্ণ চোরাচালানের অন্ধকার জগত যেন ঘিরে রেখেছে বাংলাদেশ বিমানকে।

স্বর্ণ চোরাচালানের অন্ধকার জগত যেন ঘিরে রেখেছে বাংলাদেশ বিমানকে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার ফ্লাইটে স্বর্ণ পাচারের ঘটনা নতুন নয়। তবে বিভিন্ন সময়ে পাইলট, কো-পাইলট, কেবিন ক্রু, ফ্লাইট স্টুয়ার্ড ও টেকনিক্যাল কর্মীদের বিরুদ্ধে চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গোয়েন্দা সংস্থা ও বাংলাদেশ বিমানের বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে বিমানের অন্তত ২৭২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। তালিকায় রয়েছেন পাঁচ পাইলট, চার কো-পাইলট, ২৫ কেবিন ক্রু, ১৫ ফ্লাইট স্টুয়ার্ড, তিন ফ্লাইট পার্সার ও পাঁচ চিফ পার্সারসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মী। তাদের কেউ অবসরে গেছেন, কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন, আবার কেউ বিভাগীয় শাস্তি শেষে চাকরিতে ফিরেছেন।

২০১৪ সালে বিজি-০৪৬ ফ্লাইটের স্টুয়ার্ড মাজাহারুল ইসলাম রাসেল প্রায় দুই কেজি স্বর্ণসহ আটক হওয়ার পর বিমানের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নামও সামনে আসে। ২০১৫ সালে দুবাই থেকে আসা বিজি-০৪৮ ফ্লাইটে ৬২ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় বিমানের মেকানিক ও টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক সময়েও এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর ১৪ কেজির বেশি স্বর্ণসহ বিমানের এক টেকনিক্যাল হেলপারকে আটক করা হয়। এর আগে স্বর্ণ চোরাচালানসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে কয়েকজন কেবিন ক্রুর বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তবে শাস্তির ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কারও বিরুদ্ধে শুধু তিরস্কার, কারও বেতন বৃদ্ধি বন্ধ বা পদাবনতির মতো শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ফলে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ আবার চাকরিতে ফিরেছেন। এ নিয়ে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

একজন বিমানের ক্রু নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্বর্ণ চোরাচালানের সিন্ডিকেটের শিকড় অনেক গভীরে। পরিস্থিতির শিকার হয়ে কেউ কেউ জড়ালেও অনেকে লোভে যুক্ত হন। তার দাবি, সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিপদে পড়লে একে অন্যকে উদ্ধারে সক্রিয় হয় এবং সময়ের সঙ্গে কৌশল ও নাম পরিবর্তন করে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে অন্তত ১ হাজার ৯০৬ কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট ঘিরেও বড় কয়েকটি চালান উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত স্বর্ণ চোরাচালান-সংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৭টি নিষ্পত্তি হলেও সব মামলায় মূল হোতাদের শনাক্ত বা শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, চোরাচালানে জড়িত বিমানের কর্মীদের পুনরায় কাজে ফেরানোর বিষয়টি নজরে এসেছে এবং এ নিয়ে কাজ চলছে। বিমান কর্তৃপক্ষও দাবি করেছে, চোরাচালানে জড়িতদের বিরুদ্ধে তারা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.