রাহুর দশা থেকে মুক্তি মিলছেই না জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যখন কিছুটা লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছিল তখনই করোনা ভাইরাসের কারণে ফের বেকায়দায় পড়ে সংস্থাটি। সম্প্রতি কেনা কয়েকটি বোয়িং উড়োজাহাজের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। এমনকি কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কর্তন করা হচ্ছে।
যদিও বিমানে ডেপুটেশনে আসা শীর্ষ ৫ কর্মকর্তার বেতন কাটা হচ্ছে না। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
দীর্ঘ সময় পর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু করলেও যাত্রী টানতে পারছে না বিমান। একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। অথচ বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো একই সময় ফ্লাইট চালু করে যাত্রী পাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি ও সিইও মোকাব্বির হোসেন বলেন, বিমানকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। বিমানে কোনে দুর্নীতিবাজের জায়গা হবে না। আশা করি আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব।
তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বের সব এয়ারলাইন্স লোকসানে আছে। আমরা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু করেছি। তবে যাত্রী কম পাওয়া যাচ্ছে তা সত্য। ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। খালি ফ্লাইট চালালে তো লাভ হবে না। লোকসান আরও বাড়বে। বিজনেস পলিসি একান্তই প্রতিটি এয়ারলাইন্সের ব্যাপার। আমি যদি কম যাত্রী নিয়ে চালাই তা হলে প্রতিটি ফ্লাইটে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা লোকসান হয়।
এভাবে যদি চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর ও সিলেটে কমপক্ষে ২টি করে ৬টি ফ্লাইট চালাই তা হলে দৈনিক ১২ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হবে। ব্যবসা না হয় কিছুদিন পরে হবে। সময়ের অপেক্ষা করতে হবে। ইউএস-বাংলা ও নভোএয়ার এত যাত্রী পাচ্ছে, বিমানের কেন যাত্রী সংকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, অন্যের ব্যবসায়িক ভালোমন্দ নিয়ে আমার বলার কিছু নেই।
কর্মচারীদের বেতন কর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিষয়ে যারা অভিযোগ করছে তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে মোকাব্বির হোসেন বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না। রক্ষণাবেক্ষণ, ক্রু, ইন্সুরেন্সসহ সব খরচ সংশ্লিষ্ট লিজদাতা কোম্পানি বহন করবে। গ্রহীতা শুধু অপারেট করবে। আর ড্রাই লিজে সব খরচ গ্রহীতা পরিশোধ করবে এটাই নিয়ম। বাংলাদেশে সাধারণত ড্রাই লিজে উড়োজাহাজ আনা হয়।
তিনি বলেন, গত এক বছরে কয়েকটি বোয়িং কেনা হয়েছে। এগুলো কিনতে ব্যাংক লোন নেওয়া হয়েছে। করোনার কারণে বিমানগুলো বসে আছে। আবার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালুৃ হওয়ার পরও যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। এগুলো নিয়ে বিমানকে ভাবতে হবে। কীভাবে যাত্রী টানা যায় তার কৌশল বের করতে হবে। যেখানে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রী পাচ্ছে সেখানে বিমান কেন যাত্রী পাচ্ছে না তার কারণ উদঘাটন করতে হবে। বিমানের লোকসান কমিয়ে আনতেই হবে। না হলে সংস্থাটি টেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
বেতন কর্তনে ক্ষোভ
করোনার সময়ে বিমানের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন কর্তন করা হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে প্রেষণে আসা ৫ শীর্ষ কর্মকর্তার বেতন কর্তন করা হচ্ছে না। গত ২৮ এপ্রিল বিমান পরিচালনা পর্যদের ২৩৮তম সভায় এ সিন্ধান্ত হয়। ৫ মে পরিচালক (প্রশাসন) জিয়াউদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে নতুন করে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
আদেশ অনুযায়ী বেতনক্রম ১ থেকে ৩ (২) পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মোট বেতন (গ্রস স্যালারি) থেকে ১০ শতাংশ কর্তন করা হবে। ৪ থেকে ৫ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের ১৫ শতাংশ, ৬ থেকে ৮ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের ২০ শতাংশ এবং ৯ থেকে ওপরের কর্মকর্তাদের ২৫ শতাংশ কর্তন করা হবে। পাইলটদের ক্ষেত্রে যাদের চাকরির বয়স ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে তাদের আউট স্টেশন অ্যালাউন্স কর্তনের পর যে বেতন থাকবে তার ২৫ শতাংশ কর্তন করা হবে। যাদের চাকরির বয়স ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে তাদের ক্ষেত্রেও আউট স্টেশন অ্যালাউন্স কর্তনের পর যে বেতন থাকবে তার ৩০ শতাংশ কর্তন করা হবে। যাদের চাকরির বয়স ১০ বছরের বেশি তাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়মে মোট বেতনের ৫০ শতাংশ কর্তন করা হবে। নতুন আদেশে আরও বলা হয়-বিমানে প্রেষণে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বেতন কর্তন করা হবে না। তবে তারা অন্য কোনো সুবিধা পেয়ে থাকলে বা বিমান থেকে বিশেষ ভাতা পেয়ে থাকলে সেখান থেকে ২৫ শতাংশ কর্তন করা হবে। ক্যাজুয়াল কর্মীদের ক্ষেত্রে বেতন কর্তন না করলেও তাদের বেতন-ভাতা মাসে ২২ দিন অনুসারে দেওয়া হবে।
বিমানের প্রশাসনিক শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, করোনার কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিমানের কোনো আয় নেই। করোনার জন্য আমাদের পর্যটনের সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিমানের শুধু এপ্রিল মাসেই বেতন, কিস্তি এবং অন্যান্য ব্যয়ের জন্য প্রয়োজন ৬২৮ কোটি টাকা। মে মাসেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।
বিমান শ্রমিক লীগের সভাপতি মশিকুর রহমান বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কর্তন করা হচ্ছে অথচ আমাদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে না। বিমান এমডির সঙ্গে দেখা করার সময় চেয়েও তা পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আমাদের সাক্ষাৎ দিচ্ছেন না। এক অফিসে দুই নিয়ম চলছে। প্রেষণে যারা এসেছেন তাদের বেতন কর্তন হচ্ছে না। অথচ আমাদের বেতন কর্তন করা হচ্ছে। বেতন কর্তনের ফলে অনেকে অনিশ্চয়তায় আছেন। এগুলো সুরাহা করা উচিত। সমস্যা সুরাহায় মন্ত্রী ও সচিবের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
দৈনিক আমাদের সময়