তুর্কিশ ফ্লাইটে ফিরছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মহাদেব ঘোষের নিথর দেহ

বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মহাদেব ঘোষের অকাল মৃত্যুতে দেশে ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া

ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মহাদেব ঘোষের অকাল মৃত্যুতে দেশে ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বৃহত্তর প্যারিসের ৭৮ ডিপার্টমেন্টের জো-অঁ-জোসা এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে গত ৪ মে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ফরাসি পুলিশ। কয়েকদিনের তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার (১৫ মে) তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহ গ্রহণ করে। এরপর মরদেহবাহী গাড়ি প্যারিসের শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরে পৌঁছে। পরে সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মরদেহ ঢাকার উদ্দেশে পাঠানো হয়। আগামী রোববার ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মরদেহ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।

প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে তদন্ত শুরু করে ফরাসি পুলিশ। তবে দীর্ঘ তদন্ত ও ময়নাতদন্ত শেষে ১১ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশ ঘটনাটিকে “স্বাভাবিক মৃত্যু” বলে উল্লেখ করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের সময় কক্ষে কোনো ধরনের সহিংসতার চিহ্ন বা জোরপূর্বক প্রবেশের আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়েছে যে, মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা নেই।

মাত্র ২৩ বছর বয়সী মহাদেব ঘোষ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সম্ভাবনাময় একজন শিক্ষার্থী। তিনি ফ্রান্সের খ্যাতনামা বিজনেস স্কুল এইচইসি প্যারিসে এমবিএ অধ্যয়নরত ছিলেন। এর আগে তিনি যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডন থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ থেকে তিনি পরে ইতালিতে একটি কোর্স শেষ করে ফ্রান্সে যান। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, পরিশ্রমী ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।

শুধু পড়াশোনাতেই নয়, লেখালেখিতেও ছিল তাঁর আগ্রহ। বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে নিয়মিত লিখতেন তিনি। তাঁর লেখাগুলো তরুণ সমাজের মধ্যে বেশ প্রশংসিত ছিল। বন্ধু ও সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন চিন্তাশীল, ভদ্র ও মানবিক একজন মানুষ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মহাদেব ঘোষ ঝিনাইদহ জেলার কাটালাগাড়ি বাজার এলাকার বাসিন্দা। তিনি সাবেক কৃষি সচিব শ্যামল কান্তি ঘোষ ও সাগরদীপা ঘোষ রায় দম্পতির সন্তান। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম। স্বজনরা এখনও এই মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করেছে। জো-অঁ-জোসা সিটি হল ডেথ সার্টিফিকেট প্রদান করেছে এবং প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসও দ্রুত সময়ের মধ্যে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ইস্যু করে সহযোগিতা করেছে।

এ ঘটনায় ফ্রান্সপ্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (এফবিজেএ), বাংলাদেশি স্টুডেন্টস অ্যান্ড অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক ইন ফ্রান্স এবং বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন ফ্রান্সসহ বিভিন্ন সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মহাদেব ঘোষকে স্মরণ করে শোকবার্তা দিচ্ছেন তাঁর সহপাঠী, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.