জারা খাঁন, ময়মনসিংহ থেকে ফিরে : হাওর জঙ্গল মহিষের শিং,এই তিনে ময়মনসিং’ প্রবাদ প্রবচনে এভাবেই পরিচয় করানো হতো এক সময় ভারতবর্ষের বৃহত্তম জেলা ময়মনসিংহকে। ময়মনসিংহে রয়েছে প্রাচীন স্থাপনার অনবদ্য কীর্তি। নিচে কিছু দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা তুলে ধরা হল।
১.শশীলজ
এ জেলার বেশ কয়েকটি প্রাচীন স্থাপত্য, দর্শনীয় ও ঐতিহ্যময় স্থানের মধ্যে একটি ‘শশীলজ’। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য্যরে পুত্র শশীকান্ত আচার্য্যরে নামে ‘শশীলজ’ বাসভবনটি নির্মাণ করা হয়। দ্বিতল বিশিষ্ট ও বিলাসবহুল ভবনটি চমৎকার কারুকার্যমণ্ডিত। দোতলার সিঁড়িতে হাঁটার সময় মনোরম বাজনা বাজত। নয় এক ভূমিতে ১৯৫২ সালে এই ‘শশীলজ’কে দেশের একমাত্র মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে রূপান্তরিক করা হয়। শশীলজের প্রধান ফটক পেরিয়ে ফোয়ারার ভেতরে স্নানরতা গ্রিক দেবী ভেনাসের অসাধারণ মূর্তি এবং তার চারপাশে ফুলের বাগান। ফোয়ারার সম্মুখে মূল ভবনে প্রশাসনিক কার্যালয়, বাম পাশে সুউচ্চ নকশা করা অধ্যক্ষ ভবন ও ডান পাশে টিচার্স স্টাফ কোয়ার্টার। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে শশীলজ। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহারাজা শশীকান্তের স্মৃতি। ঘুরে আসতে পারেন এ অপরূপ স্থাপনাটি।
২.শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা
আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান শিল্পী, বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পধায়ার প্রতিষ্ঠাতা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। শিল্পীর শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত ব্রহ্মপুত্র নদ তীরবর্তী নৈসর্গিক দৃশ্য পরিবেষ্টিত ভবনটি বর্তমানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা। তিনটি গ্যালারিতে শিল্পচার্যের শিল্পকর্ম, ব্যবহার্য নিদর্শন, স্থির আলোকচিত্র, সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত ও পোট্রেইট রয়েছে।
৩.নজরুল স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশাল
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব। আমাদের জাতীয় কবির শৈশব কেটেছে এ জেলার ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর গ্রামে। কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সংগ্রহশালা। নজরুল স্কুলজীবনে যে বটতলায় বসে বাঁশি বাজাতেন, তা বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমানে অবস্থিত। ঘুরে আসতে পারেন কবির শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি।
৩.ময়মনসিংহ জাদুঘর
প্রাচীনকাল থেকে এ জনপদ বিভিন্ন কারণে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। অনেক জমিদার ছিলেন এ অঞ্চলে। কালের পরিক্রমায় তাদের অনেক দুর্লভ ঐতিহাসিক নিদর্শন ইতিমধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। তাই এ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের জন্য ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ময়মনসিংহ জাদুঘর। এখানের সংরক্ষিত প্রতœসম্পদের মধ্যে গৌরীপুর জমিদার বাড়ি থেকে সংগৃহীত জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে- কাঠের পার্টিশন, সোফাসেট, শ্বেত পাথরের তৈরি টেবিল, কালো পাথরের তৈরি টেবিল টপ, ফুলদানি রাখার স্ট্যান্ড, কাঠের তৈরি বাড়ির মডেল ইত্যাদি। মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি থেকে সংগৃহীত জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে লোহার বল্লম, বলছিড়া, রামদা, খক্ষ, গণ্ডারের চামড়া, বন্য গরুর শিং ও চীন দেশের পাহাড়ি বাড়ির মডেল। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন।
৪.কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
১২০০ একরেরও অধিক জমির ওপর এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুধু আয়তনেই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে জানা-অজানা নানা রকমের ফলজ, বনজ, ভেষজ প্রজাতির ২ হাজার ২০০’র অধিক দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্র উদ্ভিদ। গ্রামবাংলার কৃষির অতীত ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম কৃষি মিউজিয়াম। এতে সংরক্ষিত আছে ৪৬১টি কৃষি-সংশ্লিষ্ট উপকরণ। এছাড়াও রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম মৎস্য জাদুঘর। যাতে বিলুপ্তপ্রায় ২৩০ প্রজাতির মাছ সংরক্ষিত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পশ্চিম অংশে রয়েছে বাংলাদেশ আণবিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (বিনা)। প্রশাসনিক ভবনের পাশেই রয়েছে আধুনিক সুবিধা সংবলিত প্রায় দুই হাজার আসনবিশিষ্ট শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তন। এর সম্মুখে রয়েছে বিজয় ৭১। এখানে দেখার মতো রয়েছে অনেক কিছু, যা দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা আসা মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে বাকৃবি প্রাঙ্গণ।
৫.আনন্দ মোহন কলেজ
ব্রিটিশ আমল থেকে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে ময়মনসিংহ অঞ্চলে যেসব বিদ্যাপীঠ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এদের মধ্যে এদেশের ক্ষেত্রে আনন্দমোহন কলেজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিমধ্যে এই ঐতিহ্যবাহী কলেজটি পেরিয়েছে শতবর্ষ। স্থাপত্য-শিল্প বিবেচনায় কলেজটি প্রাচীন কারুকার্যমণ্ডিত।
৬.মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ
মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদের স্মরণে ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ। সুদীর্ঘ এ স্মৃতিসৌধটি মানুষকে আকর্ষণ করে প্রবলভাবে। সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে সৌধের মধ্যে আশ্রয় নেয়া পাখির কলরব, ঝাঁক বেঁধে ওড়াউড়ির মনোরম দৃশ্য।
৭. ৫২-৭১ স্মৃতিতে অম্লান
ভাষা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদের স্মরণে ময়মনসিংহ পৌরসভা ও জাদুঘরের মাঝামাঝি স্থানে নির্মিত হয়েছে ‘৫২-৭১ স্মৃতিতে অম্লান’ স্মৃতিসৌধ। শহরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে দোয়েল চত্বর, শাপলা স্কয়ার, রেলি মোড়ে বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য যা ময়মনসিংহের কৃতী সন্তানদের স্মরণে নির্মিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে পুরো শহরটিকে নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে সাজিয়ে তুলছে পৌর ও জেলা পরিষদ। নতুন আঙ্গিকে টাউন হলটির নির্মাণ কাজও প্রায় শেষের পথে। টাউন হলের সামনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্কয়ার। এখান থেকে একটু দূরেই ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়। বেড়াতে পারেন ব্রহ্মপুত্র নদের উভয় তীরের চোখ ভুলানো মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন উদ্যান ও বিপণি পার্কে।
জয়নুল আবেদীন স্মৃতি পার্ক ও সংগ্রহশালা
ব্রহ্মপুত্র নদঘেষা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত জয়নুল আবেদীন স্মৃতি পার্ক শহরবাসীর প্রাণের মূল উৎস। বুক ভরা শ্বাস নেবার জন্য চমৎকার একটি জায়গা। এই পার্কে মিনি চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক ছাড়াও আছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের সংগ্রহশালা। প্রতিদিনই সকাল-সন্ধ্যা পর্যন্ত এ পার্কে ঘুরে বেড়ায় শহরবাসী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজন। এই পার্ক ঘেষা জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালায় ২০ টাকা টিকেট কেটে ঢুকতে হবে। এই সংগ্রহশালাটি প্রতিদিন শনি থেকে বুধবার
সকাল ৯.৩০ থেকে ৪.৩০ পর্যন্ত এবং শুক্রবার দুপুর ২.৩০ থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। এ ছাড়া শিশু পার্ক ও চিড়িয়াখানায় আলাদা আলাদা ভাবে টিকেট কেটে ঢুকতে হয়। পার্ক ঘেষে ব্রহ্মপুত্র নদে আছে বেশ কয়েকটা ঘাট। ঘাট গুলাতে সব সময় নৌকা বাধা থাকে। ইচ্ছে করলে নৌকা করে ঘুরতে পারেন ব্রহ্মপুত্র নদ। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার ব্রহ্মপুত্র নদ। পর্যটকদের আকর্ষণের এই কেন্দ্রবিন্দুতে হয় জোছনায় উৎসব। এই নদের থৈ থৈ নীলাভ জলে প্রকৃতিপ্রেমীরা উপভোগ করতে পারেন আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমার সৌন্দর্য। মাঝ নদীতে স্থাপিত ভাসমান মঞ্চে রাতভর বাউলা গানের আউলা সুর ঢেউ খেলবে নদের অবারিত জলে। নানা আয়োজনে জোছনা উপভোগের পাশাপাশি আছে নৌবিহার ও পাহাড় দর্শনের ব্যবস্থা।
এছাড়াও যা দেখতে পারেন : ভাষা সৈনিক আব্দুল জব্বারে যাদুঘর (গফরগাঁও) মুক্তাগাছার মহারাজা সূর্যকান্তের বাড়ি, ধোবাউড়ার চীনা মাটির টিলা ও গৌরীপুরের রাজবাড়ি, রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি, বীরাঙ্গণা সখীনার মাজার ও নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজার ইত্যাদি।
——রিপোর্টে ব্যবহৃত সব ছবি‘র মডেল লেখক নিজে