ঋণের পাহাড়, লোকসানের ভার ও প্রশ্নবিদ্ধ বিমানের ব্যবস্থাপনা

সংকটের বৃত্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

বিশেষ প্রতিনিধি
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকট, ঋণের বোঝা এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করছে। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার তুলনায়ও একটি শক্তিশালী ও টেকসই বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্স হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক ঝুঁকি মূল্যায়নে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ধারাবাহিক লোকসান, বিপুল ঋণ, উচ্চ পরিচালন ব্যয়, সীমিত বাণিজ্যিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি
বিমানের সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংস্থাটির মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। এর বাইরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে বিমানকে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু ঋণের পরিমাণই উদ্বেগের বিষয় নয়; বরং সেই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আরও বড় প্রশ্ন। বিমানের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

নতুন উড়োজাহাজ, নতুন বিনিয়োগ—নাকি নতুন বোঝা?
বহর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের চুক্তি করেছে বিমান। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, আধুনিক বহর ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়, তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—বর্তমান আর্থিক অবস্থায় এত বড় বিনিয়োগের চাপ বিমান কীভাবে সামাল দেবে?

বিমান সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, নতুন উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সেগুলোকে লাভজনকভাবে পরিচালনা করার সক্ষমতা তৈরি না হলে ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।

একচেটিয়া সুবিধা পেয়েও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিমান সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তা পেয়ে আসছে। উড়োজাহাজ কেনায় সার্বভৌম গ্যারান্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তা, বিমানবন্দরে বিশেষ সুবিধা এবং দীর্ঘদিন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে একচেটিয়া অবস্থান—সবকিছুই ছিল বিমানের পক্ষে।

তবে এসব সুবিধা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মানের সেবাদান, সময়নিষ্ঠতা, রুট ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক দক্ষতায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে বাজারে বেসরকারি ও বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বারবার পিছিয়ে পড়ছে বিমান।
কোথায় যাচ্ছে অর্থ?

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানের বড় ব্যয়ের খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ব্যয়, ঋণের সুদ, জনবল ব্যয় এবং পরিচালন ব্যয়। দীর্ঘদিন ধরে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধীরগতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, দুর্বল পরিকল্পনা এবং ক্রয়সংক্রান্ত বিতর্কও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ব্যবস্থাপনাই কি মূল সংকট?
বিমান সংশ্লিষ্ট সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করেন, আর্থিক সংকটের মূল কারণ ব্যবসায়িক নয়, বরং ব্যবস্থাপনাগত।
তাদের মতে, একটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স পরিচালনার জন্য যেসব পেশাদার সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রে সেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কাজ করে। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং আয় বৃদ্ধির কৌশল বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে বাজার হারাচ্ছে বিমান
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের বড় অংশ এখন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ও অন্যান্য বিদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়ন্ত্রণে। বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটে বিদেশি ক্যারিয়ারগুলোর আধিপত্য স্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী ট্রানজিট নেটওয়ার্ক, আধুনিক বহর এবং উন্নত সেবার কারণে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো বাংলাদেশের বাজারে ক্রমেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। অন্যদিকে বিমান এখনো সীমিত সংখ্যক লাভজনক রুটের ওপর নির্ভরশীল।

সংস্কার ছাড়া উত্তরণের পথ নেই
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানকে বাঁচাতে হলে শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনা বা সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার।
তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—
পেশাদার ও স্বাধীন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা;
রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব কমানো;
লোকসানি রুট পুনর্মূল্যায়ন;
বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক রুট সম্প্রসারণ;
ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি;

আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের ভাবমূর্তির প্রতীক। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসান, ঋণের পাহাড় এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে জাতীয় পতাকাবাহী এ সংস্থা আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখন প্রশ্ন একটাই—বিমান কি সংস্কারের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা হিসেবেই থেকে যাবে?

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.

EN