বিশেষ প্রতিনিধি : লাগেজের অতিরিক্ত ওজনের আড়ালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কুয়েত স্টেশন থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কিছু যাত্রীকে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি মালামাল বহনের সুযোগ দেওয়া হয়।
অনেক ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত ওজনের বিপরীতে আদায় করা সরকারি ফি বিমানের কোষাগারে জমা হয় না। যাত্রীদের এ সংক্রান্ত কোনো সরকারি রসিদও দেওয়া হয় না।
একইসঙ্গে প্রকৃত ওজনের চেয়ে কম ওজন দেখিয়ে লোডশিট প্রস্তুতের অভিযোগও উঠেছে, যা উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ ঘটনায় তদন্ত চললেও অভিযুক্ত এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন।
ঝটিকা তদন্তে মিলল অনিয়মের প্রমাণ
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি কুয়েত থেকে বিমানের বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটে প্রায় ১৯৩ জন যাত্রী ঢাকায় আসেন।
ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগ ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ১৪ জন যাত্রীর লাগেজ পরীক্ষা করে।
তদন্তে দেখা যায়, ওই ১৪ জনের মধ্যে ১২ জন নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ওজনের লাগেজ বহন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব অতিরিক্ত ওজনের জন্য যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও তার কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি এবং অনেক ক্ষেত্রে কোনো রসিদও ইস্যু করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, দীর্ঘদিন ধরেই একই ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্র।
একজন যাত্রীর ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ৮০ হাজার টাকা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্যে দেখা যায়, ৫৭ কেজি বহনের অনুমতি থাকলেও একজন যাত্রী প্রায় ৯৫ কেজি ব্যাগেজ বহন করেন। তিনি অতিরিক্ত ৩৮ কেজি মালামাল নিয়ে ভ্রমণ করেন। কুয়েত-ঢাকা রুটে অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য প্রতি কেজিতে প্রায় ৫ কুয়েতি দিনার চার্জ প্রযোজ্য। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার টাকা। সে হিসাবে শুধু ওই যাত্রীর ক্ষেত্রেই সরকারি রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু তদন্তে এমন কোনো সরকারি রাজস্ব আদায়ের তথ্য বা রসিদ পাওয়া যায়নি।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের অভিযানে দেখা যায়, আরেক যাত্রী ৫৭ কেজির পরিবর্তে ৮৪ কেজি ব্যাগেজ বহন করছেন। কিন্তু অতিরিক্ত ২৭ কেজি ব্যাগেজের বিপরীতে কোনো সরকারি ফি আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। আরও কয়েকজন যাত্রীর ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত মালামাল বহনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিমান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাত্র ১৪ জন যাত্রীর নমুনা পরীক্ষা থেকেই এ চিত্র পাওয়া গেছে। ফলে পুরো ব্যবস্থায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বড় হতে পারে– এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের ওজন ও ভারসাম্যের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোডশিটে প্রকৃত ওজনের চেয়ে কম তথ্য উল্লেখ করা হলে তা নিরাপদ ফ্লাইট পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এ ধরনের অভিযোগ শুধু আর্থিক নয়, নিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
কুয়েত থেকে আসা বিমানের ফ্লাইটের যাত্রীদের ব্যাগেজে অতিরিক্ত মালামাল বহনের প্রমাণ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তে নামে সংশ্লিষ্টরা। যাত্রীদের ব্যাগেজে অতিরিক্ত মালামাল বহন ও সরকারের রাজস্ব হারানোর পেছনে কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই একই স্টেশনে তার পরিবারের এক সদস্যকে পদায়ন করা হয়।যিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে কর্মরত ছিলেন।
বিমানের নথি অনুযায়ী, গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে সাক্ষাৎকারে (ইন্টারভিউ) মেধাতালিকায় ২৮ জনের মধ্যে ২৫তম অবস্থানে ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইন্টারভিউ হয় এবং দুই দিন পর ৩০ ডিসেম্বর ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ওই ফলাফলের ভিত্তিতে দেওয়া ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর আদেশে যে ১৫ জনকে বেতন বিভাগ-৭-এ উন্নীত করে সহকারী ব্যবস্থাপক থেকে উপ-ব্যবস্থাপক (গ্রাউন্ড সার্ভিস) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, তাদের মধ্যে ওই কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ বাদ পড়েন তার সামনে থাকা কেউ কেউও।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিমানের অভ্যন্তরে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। পদোন্নতি বঞ্চিত মেধা তালিকায় থাকা কয়েকজন জানান, অর্থ ও উপঢৌকনের বিনিময়ে ওই কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। এমনকি পদোন্নতি পেয়ে একটি বৈদেশিক স্টেশনের ম্যানেজার হিসেবে পদায়নও পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, একই বিদেশি স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব পালন স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন ওই স্টেশনকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সংশ্লিষ্ট স্টেশন ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, একই স্টেশনে অভিযুক্ত কর্মকর্তার স্ত্রীর পদায়নকে রহস্যময় হিসেবে উপস্থাপন করা যুক্তিযুক্ত নয়। তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন নিয়মিত কর্মী এবং প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ করে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ওই পদে বদলি হয়েছেন।
মুখপাত্র আরও বলেন, বিদেশি স্টেশনে কর্মকর্তাদের পদায়ন ইন্টারভিউ ও নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ট্রান্সফার অর্ডার হয়েছে, তবে তা এখনো কার্যকর হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তীতে তিনি স্টেশন ছেড়ে আসবেন ও অন্য কর্মকর্তা দায়িত্ব নেবেন।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও দ্য মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমান খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ সামনে এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা দেখা যায় না। ফলে অনিয়মে জড়িতদের মধ্যে পার পেয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, দুর্নীতির ঘটনা বারবার সামনে আসে। কিন্তু এসব ঘটনার পর যদি দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে অনেকে মনে করেন যে অন্যায় করেও পার পাওয়া সম্ভব। ফলে একই ধরনের অনিয়ম চলতেই থাকে।
তার মতে, একটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে লাগেজ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায়, বিদেশি স্টেশনের কার্যক্রম এবং কার্গো পরিচালনায় নিয়মিত অডিট ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ ওঠে, তাহলে তদন্ত চলাকালে তাকে সংবেদনশীল দায়িত্বে বহাল রাখা বা সংশ্লিষ্ট একই কর্মপরিসরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রশ্নের জন্ম দেয়। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট নয়, তদন্ত দ্রুত শেষ করে ফলাফল প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তিন বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অভিযুক্ত কর্মকর্তা কুয়েত স্টেশনে বহাল রয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে একই স্টেশনে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অতিরিক্ত ব্যাগেজের আড়ালে রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং এটি বিমান পরিচালনার সুশাসন ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর বিষয়। তাই এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। তার ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
