শান্তিরক্ষা মিশনে আরও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী মোতায়েনের জোরালো আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
নেতৃত্বস্থানীয় পদে নিয়োগ, বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট ও হাইতিতে নতুন মোতায়েন নিয়ে জাতিসংঘে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
মুজিবুর রহমান মাসুদ, নিউইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র)
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত করতে অধিকসংখ্যক বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী, পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জন্য আরও নেতৃত্বস্থানীয় পদ নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেন।
সোমবার (৬ জুলাই) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পৃথকভাবে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল জ্যঁ-পিয়েরে ল্যাক্রোয়া এবং অপারেশনাল সাপোর্টবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল অতুল খারে-এর সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব বিষয় তুলে ধরেন।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি সেনা, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্যরা পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।
বৈঠকে তিনি Peacekeeping Capability Readiness System (PCRS)-এর আওতায় বাংলাদেশ পুলিশের একটি Formed Police Unit (FPU)-কে Rapid Deployment Level-এ উন্নীত করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে আরও বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলাদেশি এফপিইউ মোতায়েনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান।
এছাড়া জাতিসংঘ সদর দপ্তর, আঞ্চলিক অফিস এবং বিভিন্ন ফিল্ড মিশনে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জন্য ডিরেক্টর, পুলিশ অ্যাডভাইজার, সিনিয়র স্টাফ অফিসার ও অন্যান্য কৌশলগত নেতৃত্বের পদে অধিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি জোর দেন।
জবাবে জ্যঁ-পিয়েরে ল্যাক্রোয়া বাংলাদেশের ধারাবাহিক ও পেশাদার অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও দ্রুত মোতায়েনযোগ্য পুলিশ ইউনিট গঠনে বাংলাদেশের সক্ষমতা অত্যন্ত ইতিবাচক। বহুপাক্ষিক কূটনীতি, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন উদ্যোগে বাংলাদেশের গঠনমূলক ভূমিকারও তিনি প্রশংসা করেন।
অন্যদিকে অপারেশনাল সাপোর্টবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল অতুল খারের সঙ্গে বৈঠকে হাইতিতে সম্ভাব্য বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট মোতায়েন, শান্তিরক্ষীদের জন্য আধুনিক সরঞ্জাম, পরিবহন সুবিধা, রিইম্বার্সমেন্ট প্রক্রিয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং নারী শান্তিরক্ষীদের জন্য নিরাপদ ও উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ শান্তিরক্ষী এবং বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট পাঠাতে প্রস্তুত রয়েছে। ভবিষ্যতের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে প্রযুক্তি, দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা এবং নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
জবাবে অতুল খারে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনাল ও লজিস্টিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশি সদস্যরা দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত প্রশংসিত।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশি সেনা ও পুলিশ সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের এই ধারাবাহিক অবদান দেশের পররাষ্ট্রনীতি, বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
