ভারত ভ্রমণ বাতিল করছেন বাংলাদেশীরা

airticket_946অর্থ লোপাট ও কালো টাকার আগ্রাসন ঠেকাতে গত মঙ্গলবার ভারতে ৫০০ ও ১ হাজার রুপির নোট বাতিল করেছে ভারত সরকার। এতে বিপাকে পড়েছেন ভারতে বিভিন্ন কাজে ভ্রমণরত বাংলাদেশীরা। এ অবস্থায় নতুন করে ভারত ভ্রমণে বাংলাদেশীদের আগ্রহ কমছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন পরিবহনের টিকিট বুকিং বাতিল করছেন অনেকে।

জানা গেছে, টিকিট বাতিলের কারণে গতকাল চট্টগ্রাম থেকে শ্যামলী, সোহাগ ও গ্রীনলাইনের বেশ কয়েকটি বাস সার্ভিস বাতিলও করা হয়েছে। আশানুরূপ যাত্রী না থাকায় আগামী কয়েক দিনের সার্ভিস চালানো হবে কিনা, সে বিষয়েও নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না।

রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি বাস সার্ভিস, উড়োজাহাজের টিকিটের এজেন্ট ও ট্রাভেলসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, মঙ্গলবার রাতে ভারতের সরকার ৫০০ ও ১ হাজার রুপির নোট নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়ার পর বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানে ভারতে যেতে ইচ্ছুক যাত্রীর সংখ্যা কমে গেছে। এরই মধ্যে সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের ভোগান্তির খবর ছড়িয়ে পড়ায় ভারতে গমনেচ্ছুরা শঙ্কায় পড়েছেন। খুবই প্রয়োজন ছাড়া আপাতত কেউ ভারতে যেতে আগ্রহী হচ্ছেন না। যেসব যাত্রী চিকিত্সা কিংবা ব্যবসায়িক কাজে আগাম ভারতীয় মুদ্রা সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, তারাই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। মানি এক্সচেঞ্জ কিংবা কার্ব মার্কেটে ভারতীয় বড় দুই নোটের লেনদেন আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছোট নোট সংগ্রহ করতে না পারলে ভারতে যাওয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন তারা।

ভারতে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশীদের বর্তমান সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে এয়ার টিকিট বিক্রয় প্রতিষ্ঠান বি-ফ্রেশের ব্যবস্থাপক সুমন আইচ বলেন, বি-ফ্রেশের একজন এক্সিকিউটিভ প্রতিদিন ৮-১০টি কলকাতাগামী টিকিট বিক্রি করেন। ১১ ও ১২ তারিখের কোনো বিমানের টিকিট বাতিল করার ঘটনা না থাকলেও বর্তমানে প্রতিদিন দু-একটির বেশি টিকিট বিক্রি হচ্ছে না। ভারত যেতে আগ্রহী যাত্রীরা প্রতিদিন খোঁজখবর নিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভারত ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছুটা পিছুটান দেখাচ্ছেন।

দেশের বেশ কয়েকটি সড়ক পরিবহন সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির বাস ভারতে যাত্রী পরিবহন করে। সোহাগ, গ্রীনলাইন, এস আলম, ইউনিক, শ্যামলী পরিবহন সরাসরি এবং বেনাপোল হয়ে কলকাতায় যাত্রী পরিবহন করে। এর মধ্যে শুধু শ্যামলী পরিবহন সরাসরি ভারতে যাত্রী নিয়ে যায়। ভারতের বড় দুই মুদ্রা নিষিদ্ধের কারণে এসব পরিবহনের অর্ধেক যাত্রীই কমে গেছে। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার শ্যামলী ও গ্রীনলাইন পরিবহনের চট্টগ্রাম থেকে কোনো বাস কলকাতার উদ্দেশে ছেড়ে যায়নি। তবে ঢাকা থেকে বাস ছাড়লেও যাত্রীচাপ ছিল কম। যাত্রীদের কাছে অগ্রিম টিকিট বিক্রির সুবিধা দেয়া হলেও কয়েক দিন ধরে ভারতে যেতে আগ্রহী যাত্রীর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকটি পরিবহনের কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নয়ন কুমার মজুমদার। গ্রীনলাইন পরিবহনে করে আগামী শুক্রবার কলকাতায় যেতে আগাম টিকিট করেছিলেন। কিন্তু ভারতে রুপি নিষিদ্ধের খবর পেয়ে গত বুধবার টিকিট বাতিল করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভারতে যাওয়ার বিষয়ে এখনো সন্দিহান তিনি।
সাতকানিয়া উপজেলার দিপু নাগ জানান, সোহাগ পরিবহনে কাল রোববার ভারতে যাওয়ার টিকিট করলেও গতকাল শুক্রবার ওই টিকিট বাতিল করেন তিনি। চিকিত্সার প্রয়োজনে কলকাতায় যাওয়ার কথা থাকলেও ভারতীয় রুপি নিষিদ্ধ হওয়ায় ক্রয় করা ভারতীয় রুপি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। এ অবস্থায় খুচরা নোট কিংবা ডলার ছাড়া ভারতে যাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, হাজারীগলি, টেরিবাজার, আছাদগঞ্জ, নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীদের অনেকেই ভারত থেকে পণ্য আমদানি করেন। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অনেকের নিয়মিত ভারতে যাতায়াত থাকলেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যাত্রা বাতিল করছেন তারা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসা ও নতুন মুদ্রা সংগ্রহ না করে তাদের কেউ ভারতে যেতে চাইছেন না।

চট্টগ্রামের দামপাড়াস্থ শ্যামলী পরিবহনের ম্যানেজার রুপম পালিত বলেন, চট্টগ্রাম থেকে দুটি ও ঢাকা থেকে চারটি বাস প্রতিদিন কলকাতায় যাত্রী পরিবহন করে। শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে দুটি বাস যাওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই টিকিট বাতিল করেছেন। এ অবস্থায় দুটি বাসে মাত্র দুজন যাত্রী অবশিষ্ট থাকায় যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। এক্ষেত্রে যাত্রী পাওয়াসাপেক্ষে আগামীতে বাসের শিডিউল নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।

সোহাগ পরিবহনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতগামী যাত্রী কমেছে অস্বাভাবিক হারে। প্রতিদিন এসি ও নন-এসি মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে ১১টি বাস কলকাতা রুটে যাত্রী পরিবহন করলেও গত কয়েক দিনে যাত্রী কমে যাওয়ায় শিডিউল মেলাতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। আগাম টিকিট বাতিলের কারণে বিভিন্ন শিডিউলের যাত্রীদের সমন্বয় করে তবেই বাস ছাড়তে হচ্ছে। এক্ষেত্রে নতুন করে কেউ কলকাতাগামী বাসের টিকিট করতে এলে নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়াসাপেক্ষে বাস ছাড়ার নিশ্চয়তা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

সোহাগ পরিবহনের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ম্যানেজার মো. রিপন খান বলেন, প্রতিটি বাস নিয়মিত চালাতে কমপক্ষে ২০ জন যাত্রী প্রয়োজন। কিন্তু পাঁচ-সাতজন যাত্রী দিয়ে সার্ভিস চালানো সম্ভব নয়। এজন্য গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি শিডিউল বাস সার্ভিস বন্ধ ছিল। তবে যাত্রী পাওয়াসাপেক্ষে আগামীতে সার্ভিস চালানো হবে।

একই কথা বলেন, যশোরের টেক অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মো. আলমগীর হোসেন। তিনি জানান, ভারতীয় ৫০০ ও ১ হাজার রুপির নোট বাতিলের ঘটনায় অনেকেই সাময়িকভাবে ভারত যেতে চাইছেন না। আগাম টিকিট করা যাত্রীরা এরই মধ্যে যাত্রার তারিখ পরিবর্তন করতে চাইছেন। চিকিত্সা, ভ্রমণ ও ব্যবসায়িক কাজে অনেকে আগাম টিকিট করলেও বিড়ম্বনা এড়াতে একান্ত গুরুত্বপূর্ণ না হলে কেউ যেতে চাইছেন না।

চট্টগ্রাম ও ঢাকার বেশ কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই তাদের গ্রাহকদের টিকিট, হোটেল বুকিং ছাড়াও ভারতীয় কিংবা বিদেশী মুদ্রা বিনিময়ের সুবিধা দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যেসব যাত্রী আগে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নিয়েছেন, মজুদ ভারতীয় রুপি পরিবর্তনের জন্য তাদের কাছে আসছেন। ট্রাভেল এজেন্টরাও বর্তমানে যেসব ভ্রমণকারী ভারতে যাচ্ছেন, তাদের মাধ্যমে ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোট বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করছেন। তবে অতিরিক্ত পরিমাণ নোট মজুদকারীদের সহযোগিতা করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন কয়েকটি এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।

এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে শুক্র, রবি ও বুধবার বাংলাদেশ থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন ভারতে যাত্রী পরিবহন করে। গত কয়েক দিনের ট্রেনগুলো শিডিউল অনুযায়ী চলাচল করলেও আগাম টিকিটের কাউন্টারে ভিড় তুলনামূলক কম।

চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, এখন পর্যন্ত পূর্বের কেনা টিকিট বাতিলের জন্য কেউ আসেননি। তবে আগাম টিকিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে যাত্রীদের অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.