ঘুরে আসুন ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরির শহর।
দ্বীপ রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের একটা ইচ্ছা ছিল অনেক দিনের। ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণে এখন বাংলাদেশীদের ভিসার প্রয়োজন হয় না তাই এ সুযোগটা নিলাম।
ইন্দোনেশিয়ায় যা কিছু দেখব বলে ভ্রমণ তালিকা করেছিলাম, তার মধ্যে একটি ছিল- আগ্নেয়গিরি দেখা। উত্তর সুমাত্রায় বন্য ওরাংওটাং দেখার পর্ব শেষে রওনা হই পরবর্তী বেরাস্তাগি টাউনের উদ্দেশ্যে।
বেরাস্তাগিকে বলা হয় আগ্নেয়গিরি টাউন। ফল-সবজির টাউনও বলা হয়ে থাকে।
হোটেল ছাড়ার সময় এক লোক বললেন, সেখানকার ফলের মার্কেটে যেতে যেনো না ভুলি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, খুব ফল পাওয়া যায় বুঝি সেখানে? লোকটি বললেন, নানান জাতের প্রচুর ফল পাওয়া যায়।
আরও বললেন, কিছু জাতের ফল তিনি জীবনে প্রথমবার বেরাস্তাগির মার্কেটে দেখেছেন।
বুকিত লাওয়াং থেকে বেরাস্তাগি টাউন চার ঘণ্টার রাস্তা। শেয়ারিং গাড়িতে করে আমরা কয়েকজন। লোকাল বাসে সময় লাগে বেশি। যেতে যেতে মোবাইল ইন্টারনেটে বেরাস্তাগির ফলের মার্কেটটি দেখলাম। সেখান থেকে কিছু ফলমূল কিনে তারপর হোটেলে উঠব ঠিক করলাম।
আগ্নেয়গিরির এলাকা হওয়াতে এখানে ফলের ও সবজির ফলন হয় ভালো। আগ্নেয়গিরির ছাই প্রাকৃতিক জৈব সার হিসেবে কাজ করে। ফসলাদির জন্য খুবই ভালো আগ্নেয়গিরি ভূমি।
শহরের একটু বাইরে গিয়ে হাঁটলে দেখতে পাবেন বিশাল বিশাল স্ট্রবেরি ক্ষেত, ভেতর দেখা পাবেন স্ট্রবেরি ফেরিওয়ালার। শহরের চাহিদা মিটিয়ে ইন্দোনেশিয়ার আরও বিভিন্ন শহরে যায় বেরাস্তাগির ফল ও সবজি।খুব কাছে থেকে আগ্নেয়গিরি দেখার একটা ইচ্ছা ছিল আমার। বেরাস্তাগিতে দুটো আগ্নেয়গিরি রয়েছে। শহরের একদম কাছেই মাউন্ট সিবায়াক ও অপরটি মাউন্ট সিনাবুং আগ্নেয়গিরি। দুটোই জীবিত আগ্নেয়গিরি।
বেরাস্তাগি শহর কেন্দ্র থেকে মাউন্ট সিবায়াকের উড়ন্ত ধোঁয়া দেখলাম। জীবনে প্রথমবার দেখলাম জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। সত্যিই অসাধারণ সেই অনুভূতি!
আগ্নেয়গিরির লাভা দেখার একটা ইচ্ছা ছিল আমার। লাভা ছুঁয়ে দেখারও একটা শখ ছিল মনে। এখানকার এক পিৎজা দোকানের নাম দেখে কিছুক্ষণ হাসলাম। দোকানের নামটি বেশ মজার, ‘লাভা লাভা পিৎজা।’
আগ্নেয়গিরি সিবায়াকের চূড়ার চড়ার অনুমতি রয়েছে। কেউ চাইলে স্থানীয় গাইডের সহযোগিতায় বা আগে ক্লাইম্বিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকলে নিজে নিজেও চড়তে পারবেন চূড়ার। সিবায়াক আগ্নেয়গিরির শেষ অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল একশ চল্লিশ বছর আগে।
আগ্নেয়গিরি সিবায়াকের চূড়ায় জ্বালামুখে একটি ছোটখাটো গর্ত রয়েছে। গর্তে পানি আছে। অত্যন্ত গরম পানি। আর নিচে রয়েছে অসংখ্য হট স্প্রিংস। আপনি এখানে খুব সস্তায় সহজেই হট স্প্রিংস এর অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন।
হট স্প্রিংস এর পানিতে সালফারসহ আরও বিভিন্ন ধরনের খনিজ উপাদান থাকায় এই পানিতে শরীর ভিজিয়ে রাখলে নানা উপকার হয়। চর্ম রোগ ও শরীরের ব্যথা উপশম হয়।
সিনাবুং আগ্নেয়গিরি বেরাস্তাগি শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। এটি উচ্চতায় দুই হাজার ৪৬০ মিটার। কাছে যাওয়ার অনুমতি নাই।
আশপাশের পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। আর্মি নিয়োজিত রয়েছে। এখানকার জন শূন্যহীন একটি গ্রাম এখন ভূতের গ্রামে পরিণত হয়েছে। ট্যুর বুক করে সেখানে যাওয়া যাবে।
সিনাবুং আগ্নেয়গিরির শেষ অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারিতে। অগ্ন্যুৎপাতের ধোঁয়া উড়া একটি ছবি হোটেল মালিক আমাকে দেখালে ভয় পেয়ে যাই আমি। তিনি নিজে এই ছবিটি তুলেছেন বললেন।
বেরাস্তাগির গুন্ডালিং নামক একটি উঁচু জায়গা থেকে সিনাবুং আগ্নেয়গিরির দৃশ্য দেখা যায়।
যদি আবহাওয়া ভালো থাকে আর আকাশ পরিষ্কার থাকে তাহলে এখান থেকে আপনি উড়ন্ত ধোঁয়াসহ সিনাবুং আগ্নেয়গিরি ক্যামেরাবন্দি করতে পারবেন। কিছু প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার আছেন। খুব সস্তায় পর্যটকদের ফটো তুলে দেন।
আগ্নেয়গিরি দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সঙ্গী করে বেরাস্তাগিকে বিদায় জানিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্য লেক টোবায়। ইহা একটি মহাআগ্নেয়গিরির জ্বালামুখজুড়ে অবস্থিত বৃহৎ প্রাকৃতিক হ্রদ। লেকটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এ গল্প আরেকদিন!