পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশনের শুভ সূচনার মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। উদ্বোধনের পর থেকেই এই ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে পর্যটকদের যাতায়াত প্রতিদিনই বাড়ছে। পণ্য আমদানি-রপ্তানিও চলছে সমান গতিতে। তবে এখনও কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়ে গেছে। যে কারণে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হলে যাত্রী পারাপারে যেমন জনপ্রিয়তা পাবে চেকপোস্টটি, তেমনি বাড়বে রাজস্ব আয়ও।
এই চেকপোস্টটি দেশের পর্যটন বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তেঁতুলিয়াই হতে পারে একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। দেশের সবচেয়ে উত্কৃষ্টমানের ও রপ্তানিযোগ্য চা উত্পন্ন হচ্ছে এই পঞ্চগড়ে। এদিক থেকে ইমিগ্রেশন চালু হওয়ায় জেলাটি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে সমৃদ্ধি পাবে অচিরেই। তবে ভারত-বাংলাদেশের জনগণের ইমিগ্রেশনের প্রধান বাধা হচ্ছে ভিসা বিষয়ক জটিলতা। এই জটিলতা যত তাড়াতাড়ি দূর হবে তত বেশি জনপ্রিয়তা পাবে এই ইমিগ্রেশনটি। এছাড়া দেশের অন্যান্য উন্নত ইমিগ্রেশনগুলোর মত সুযোগ-সুবিধা যদি সংযোজন করা হয় তাহলে শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়, এই ইমিগ্রেশন দিয়ে নেপাল ও ভুটানের যাত্রীরাও ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন অতি সহজেই। তাই ইমিগ্রেশনটির জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে উভয় দেশের চেকপোষ্টের অসঙ্গতিগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে উভয় দেশকেই ব্যবস্থা নিতে হবে ।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট চালু হওয়ায় পঞ্চগড় এখন পর্যটন ও শিল্প নগরীতে রূপ নেবে। কেননা বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি স্থলবন্দর থেকে ভারতের শিলিগুড়ি শহর মাত্র ৬ কিলোমিটার, জলপাইগুড়ি শহর ১০ কিলোমিটার, দার্জিলিং ৫৮ কিলোমিটার, নেপালের কাকরভিটা ৬১ কিলোমিটার, ভুটানের ফুলসিলিং শহর মাত্র ৬৮ কিলোমিটার। শিলিগুড়ি ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিষ্টারের একমাত্র প্রবেশ পথ। পর্যটকরা যাতায়াত করলে উভয় দেশই লাভবান হবে।
বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি এই স্থলবন্দর দিয়ে মানুষ পারাপার কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়। এর পর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে ৭৭৪ জন পর্যটক উভয় দেশে যাতায়াত করেছেন। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে যাতায়াত করেন ১২৩ জন এবং মার্চ মাসে যাতায়াত করেন ৬৫১ জন যাত্রী। ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতে গেছেন ৫৩ জন, বাংলাদেশে এসেছেন ৭০ জন। আর মার্চ মাসে ভারতে গেছেন ৩৯০ জন এবং বাংলাদেশে এসেছেন ২৬১ জন যাত্রী। তবে প্রতিদিনই মানুষ পারাপার বাড়লেও কিছু সমস্যা ও জটিলতা থাকায় দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ডলার ইনডোর্স ও মানি এক্সচেঞ্জ সুবিধা না থাকায়, ব্যাগেজ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে জটিলতায় এবং জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ২শ’ গজ ব্যাগেজ বহন করার সুবিধা না থাকায় দুর্ভোগ পোহান পর্যটকরা। জিরো পয়েন্টে যেটুকু সড়ক রয়েছে তা আমদানি-রপ্তানি কাজে ট্রাকের আসা-যাওয়ায় প্রায় সময়ই বন্ধ থাকে। ফলে যাত্রীদের উঁচু-নিচু পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এছাড়া রাজধানী ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধায় সরাসরি যানবাহন নেই। এমনকি বাংলাবান্ধা থেকে দিনাজপুর ও রংপুর পর্যন্ত সরাসরি গাড়ি না থাকায় এই চেকপোস্ট ব্যবহারকারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে বাংলাবান্ধায় কয়েকটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়ছেন পর্যটক, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাসহ স্থানীয়রা। এছাড়া অবৈধ কর্মকান্ড বন্ধে এই চেকপোস্টে সিসি ক্যামেরা ও স্ক্যানিং মেশিনও চোখে পড়েনি।
ঢাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম সম্প্রতি বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ব্যবহার করে ভারতে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, ব্যাগেজ ক্লিয়ারেন্সের জন্য জিরো পয়েন্টে কাষ্টমসের কোন অফিস নেই। ফলে ব্যাগেজ বহন করে জিরো পয়েন্ট থেকে ২শ’ গজ ভেতরে হেঁটে যেতে হয়। যা অনেক কষ্টের।
ভারতে যাতায়াতকারী সফিকুল আলম জানান, চেকপোস্টে ডলার ইনডোর্স ও মানি এক্সচেঞ্জ করার সুবিধা নেই। এর ফলে বেশ অসুবিধায় পড়তে হয়। তবে একাধিক দেশ ভ্রমণকারী মো. মঈনউদ্দিন, আবুল কাশেম রুমেল জানান, বাংলাবান্ধা চেকপোস্টটি ভ্রমণকারীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক। এখানে দালালমুক্ত সেবা পাওয়া যায়।
এই চেকপোস্ট ব্যবহারকারী কামরুজ্জামান শাহানশাহ জানান, আগে ভারতে যেতে আমাদের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী-চেংরাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ব্যবহার করতে হতো। সেখানে পুরো একদিন লেগে যেত চেকপোস্ট এলাকায় পৌঁছতে। অথচ বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ঘন্টা দুয়েক। ছোটখাট কিছু সমস্যা আছে, এসব সমাধান করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হবে এই চেকপোস্টটি।
ইমিগ্রেশন পুলিশের এসআই কানন ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. শাহাজাহান সিরাজ জানান, চেকপোস্ট অফিসটি দালালমুক্ত হওয়ায় বৈধ পাসপোর্টধারী মানুষ নির্বিঘ্নে যাতায়াত করছেন। আমরাও যাত্রীদের শতভাগ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।
তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শাহীন জানান, চেকপোস্ট সংলগ্ন এলাকায় গ্রামীণ, বাংলালিংক, টেলিটক, এয়ারটেলসহ কয়েকটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক না থাকায় সমস্যায় পড়েন উভয় দেশে ভ্রমণকারী পর্যটকরা। তবে খুব শিগগিরই বাংলাবান্ধায় শক্তিশালী টাওয়ার নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন গ্রামীণ ফোন পঞ্চগড়ের টেরিটরি অফিসার জীবন কুমার শীল।
বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহসে উল গনি জানান, চেকপোস্ট দিয়ে প্রতিদিনই মানুষ পারাপার বাড়ছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় ভারত, নেপাল, ভুটানসহ চীনের পর্যটকরা বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি চেকপোস্ট ব্যবহারে উপকৃত হচ্ছেন। তবে ভিসা জটিলতা, ডলার ইনডোর্স, মানি এক্সচেঞ্জ, আবাসন সমস্যা, সরাসরি যানবাহন চলাচল না করাসহ কিছু সমস্যার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এসব জটিলতা শিগগিরই কেটে যাবে।
পঞ্চগড় কাষ্টমস, ভ্যাট ও এক্সাইজের সহকারী কমিশনার মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, সমস্যাগুলো আমরাও চিহ্নিত করেছি। বিষয়গুলো জানিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সমস্যাসমূহ সমাধান হলে এই চেকপোস্ট দিয়ে সরকারের রাজস্ব আয় অনেক গুণ বেড়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সভাপতি আশরাফুল আলম পাটোয়ারী জানান, পুর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে এটি চালু হওয়ায় নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সরকার পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া পঞ্চগড়ে ‘বিবিআইএন’ (বাংলাদেশ-ভূটান-ভারত-নেপাল) অর্থনৈতিক জোনের সদর দপ্তর স্থাপনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এটা হলে এখানে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের। ধীরে ধীরে পুরো উত্তরাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে।
