বিশেষ প্রতিনিধি : জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, কর ও শুল্কের অসহনীয় চাপ, যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ ব্যয়, আর্থিক ও নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং প্রশাসনিক জটিলতা মিলিয়ে পুরো এভিয়েশন খাতকে বিপর্যয়কর অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, অপারেটর ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান করনীতি ও শুল্ক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের এভিয়েশন শিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খাবে; বিনিয়োগ কমে যাবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে, সেবার মান নেমে আসবে এবং আকাশপথে যাত্রী চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি অপারেটর প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে এবং যারা এখনও টিকে আছে, তাদের অনেকেই লোকসান গুনে কিংবা ভর্তুকিনির্ভর অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে।
এই অবস্থায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে ‘এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে ১১টি খাতে কর অব্যাহতি, শুল্ক প্রত্যাহার, করহার হ্রাস এবং নীতিগত সংস্কারের একটি বিস্তৃত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রস্তাবনায় বলা হয়, এ মুহূর্তে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নিলে সম্ভাবনাময় খাতটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে পড়বে এবং বিদেশি এয়ারলাইন্সের হাতে ব্যবসা চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বর্তমান করনীতি এভিয়েশন শিল্পের প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং তা অপারেশনাল ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ব্যবসা পরিচালনাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
প্রস্তাবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে জেট ফুয়েলের ওপর আরোপিত কর ও শুল্ককে। বর্তমানে
প্রতিলিটার জেট ফুয়েলের সিআইএফ মূল্য ১৪৯.৫৬ টাকা হলেও এর ওপর প্রায় ৪১.২৮ টাকা কর আরোপ করা হয়, যা মোট মূল্যের প্রায় ২৭.৬০ শতাংশ। এর সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অপারেশনাল খরচ হিসেবে আরও ১১.৪৫ টাকা যোগ হয়।
ফলে জ্বালানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে এয়ারলাইন্স ও হেলিকপ্টার অপারেশন পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই বাড়তি ব্যয়ের সরাসরি প্রতিফলন ঘটছে টিকিটের মূল্যে, যার ফলে যাত্রীদের জন্য আকাশপথে ভ্রমণ সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে অ্যাসোসিয়েশন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে জেট ফুয়েলের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক ও আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করহার সমন্বয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
তাদের যুক্তি, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ব্যবহৃত জ্বালানির দামের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য রাখা হয় না। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও জেট ফুয়েলের ওপর কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে, অথচ বাংলাদেশে উল্টো করের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা এই খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করছে।
অন্যদিকে উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রেও উচ্চ শুল্ক ও কর বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে এসব যন্ত্রাংশের ওপর আমদানি শুল্ক এবং অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও বাড়ানো হয়েছে।
এর ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে এবং অপারেটরদের জন্য নিয়মিত ও নিরাপদ অপারেশন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, এ খাতে আরোপিত শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হলে অপারেশনাল ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে।
উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। বিভিন্ন এইচএস কোডের আওতায় টার্বোজেট ও টার্বোপ্রোপেলার ইঞ্জিনের ওপর শুল্ক ও কর আরোপ করা হচ্ছে, যা এই অত্যন্ত ব্যয়বহুল যন্ত্রাংশের দাম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং বিদ্যমান অপারেটরদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে এই খাতেও শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন আরও উল্লেখ করেছে, স্পেয়ার পার্টস আমদানির ক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা না থাকায় অপারেটরদের আমদানি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। যদি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা চালু করা হয়, তাহলে দ্রুত শুল্কায়ন সম্ভব হবে, অপারেশনাল ব্যয় কমবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি যাত্রীসেবায় পড়বে।
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কর কাঠামো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় প্রশিক্ষণের ওপর ১০ শতাংশ এবং বিদেশি প্রশিক্ষণের ওপর ২০ শতাংশ আয়কর আরোপ করা হয়, পাশাপাশি ১৫ শতাংশ মূসকও প্রযোজ্য। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ জনবল তৈরি ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি ফ্লাইট নিরাপত্তা, অপারেশনাল দক্ষতা এবং সেবার মানের ওপর পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণ ব্যয়ের ওপর থেকে সব ধরনের কর ও মূসক প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাত্রীদের ওপর আরোপিত কর ও ফি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে যাত্রীপ্রতি প্রায় ১১২৫ টাকা কর ও ফি আরোপ করা হয়, যা মোট ভাড়ার প্রায় ৪২ শতাংশ। এই হার কমিয়ে ৭২৫ টাকায় নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন।
তাদের মতে, অতিরিক্ত করের কারণে টিকিটের মূল্য বেড়ে যায়, ফলে যাত্রীসংখ্যা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্বও প্রত্যাশিত মাত্রায় আসে না।
আয়কর আইনের ধারা ১৬৩ নিয়েও গুরুতর আপত্তি জানানো হয়েছে। এই ধারার ফলে লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ন্যূনতম কর দিতে বাধ্য করা হয়, যা কর ব্যবস্থার মৌলিক নীতির পরিপন্থি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উৎসে কাটা কর ফেরত পাওয়া যায় না, ফলে প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মূলধন সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং আর্থিক প্রবাহে চাপ সৃষ্টি হয়। তাই এই ধারা সংশোধন বা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।
একইভাবে আয়কর আইনের ধারা ২২৬ অনুযায়ী কর ফেরতের বিধান থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কর ফেরত পেতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। এ অবস্থায় দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ব্যাংক ট্রান্সফারভিত্তিক কর ফেরত ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা সময়মতো তাদের প্রাপ্য অর্থ ফিরে পান।
স্বনির্ধারিত পদ্ধতিতে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও শিথিল করার প্রস্তাব এসেছে। অ্যাসোসিয়েশনের মতে, সব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কাঠামো ও সক্ষমতা এক নয়, তাই বিকল্প পদ্ধতি চালু করা হলে কর পরিপালন সহজ হবে এবং করদাতাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে।
হেলিকপ্টার আমদানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধিকে খাতটির জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে মোট করহার ছিল ১০ শতাংশ, তা ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৩৭.২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে নতুন হেলিকপ্টার আমদানিতে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং খাতটির সম্প্রসারণ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে। তাই আগের করহার পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়েছে।
চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার সেবার ক্ষেত্রেও উচ্চ করের কারণে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এই সেবার ওপর ১৫ শতাংশ মূসক এবং ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়। ফলে কোনো সেবার মূল ভাড়া ১ লাখ টাকা হলে করসহ তা প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছে যায়। এতে গ্রাহকরা এই সেবা গ্রহণ থেকে বিরত থাকছেন এবং অপারেটররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি চার্টার্ড সেবার বিলের ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিষয়টিও অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে, যা ফেরত পাওয়া কঠিন। এই কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেছন, সরকার যদি এভিয়েশন খাতকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে জরুরি ভিত্তিতে কর-সুবিধা প্রদান, শুল্ক হ্রাস এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায় একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, কর্মসংস্থান কমে যাবে এবং দেশের আকাশপথ পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শক্তিশালী, টেকসই এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এভিয়েশন খাত গড়ে তুলতে হলে কর কাঠামোকে অবশ্যই ব্যবসাবান্ধব করতে হবে এবং বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
না হলে সম্ভাবনাময় এই শিল্প খাত ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবে এবং দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে।