বিমান কর্মকর্তা এম খানমের বিরুদ্ধে নথি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাহক সেবা বিভাগের কর্মকর্তা এম খানমের বিরুদ্ধে শিক্ষাগত সনদ, চাকরিতে পদায়ন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের একটি পক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, এম খানম ১৯৯৯ সালে বিমানের গ্রাহক সেবা বিভাগে ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন। সে সময় শেখ হাসিনার তৎকালীন উপদেষ্টা এস এ মালেকের সুপারিশে তিনি চাকরিতে যোগদান করেছিলেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিতে যোগদানের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে এসএসসি, এইচএসসি ও ডিগ্রির মধ্যে নির্দিষ্ট বিভাগীয় ফলাফল প্রয়োজন ছিল। এম খানমের শিক্ষাগত সনদ পর্যালোচনায় জন্মতারিখ ঘষামাজা এবং বিভিন্ন অংশে হাতের লেখার অসঙ্গতি দেখা গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব নথির সত্যতা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও প্রতিষ্ঠান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসএসসি সনদ অনুযায়ী এম খানম ১৯৮৫ সালে ফরিদপুরের একটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বান্দরবানের লামা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করার তথ্য পাওয়া যায় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন। একই সনদে কিছু সংশোধন ও লেখার অসঙ্গতি রয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ১৯৮৫ সালে এসএসসি পাস করার পর ১৯৯১ সালে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টি কীভাবে হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বোর্ডের মূল রেকর্ডে কী তথ্য রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
এম খানমের ডিগ্রি সনদেও কথিত ঘষামাজার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়/শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা বোর্ডের সংরক্ষিত মূল রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চাকরিজীবনের শুরুতে এম খানম স্বল্প সময় ট্রাফিক শাখার গ্রাহক সেবা বিভাগে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় হোটেল বিল সংক্রান্ত কাজে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতির পর তার বদলি ও হোটেল বিল সংক্রান্ত আর্থিক বিষয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত, নথি বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের ফলাফল থাকলে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এছাড়া ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে আটক করার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও এম খানমের ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সেদিন তার নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে বিমানবন্দরের টার্মিনালে তার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি তার স্বামীর সঙ্গে তার উপস্থিতি এবং কথিত আর্থিক লেনদেন নিয়েও বিভিন্ন কথা ছড়িয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া না গেলে তা সত্য হিসেবে প্রচার করা সমীচীন নয়।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এম খানম পুনরায় গ্রাহক সেবা বিভাগে যোগ দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে হোটেল বিল শাখায় তার পদায়ন নিয়েও প্রশাসনিক নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, এম খানমের জন্মতারিখ, পরিচয়পত্র এবং তার স্বামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ঘোষণাপত্রে অসঙ্গতি রয়েছে। বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর তথ্য পাচার এবং প্রভাব খাটিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা বিমানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থার জন্য গুরুতর বিষয়। আর অভিযোগগুলো অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
এ কারণে এম খানমের—
- নিয়োগের সময় জমা দেওয়া মূল শিক্ষাগত সনদ ও বোর্ডের রেকর্ড;
- জন্মতারিখ ও পরিচয়সংক্রান্ত মূল নথি;
- নিয়োগ ও পদোন্নতির ফাইল ও সার্ভিস রেকর্ড;
- বিভিন্ন সময়ে পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের অফিস আদেশ;
- হোটেল বিল সংক্রান্ত আর্থিক নথি ও অডিট রিপোর্ট;
- ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বিমানবন্দরে তার উপস্থিতি সংক্রান্ত ডিউটি রোস্টার ও সিসিটিভি/প্রবেশ রেকর্ড;
- এবং তার বিরুদ্ধে কোনো দুদক বা সরকারি তদন্ত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি
স্বাধীনভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে এম খানমকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।