বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর দুর্নীতির অন্যতম খাত হলো- গ্রাউন্ড সার্ভিস খাত। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশীভাবে উচ্চমূল্যে নিন্মমানের যন্ত্রপাতি (ইক্যুইপমেন্ট) ক্রয় করা হয়। অদক্ষতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ইক্যুইপমেন্ট ক্রয় না করে অপ্রয়োজনীয় ইক্যুইপমেন্ট ক্রয় করা হয়। ক্রয়কৃত ইকুইপমেন্টের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এমনকি রক্ষণাবেক্ষণের মূল্যবান উপকরণ বিক্রি করে আত্মসাৎ করা হয়। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যন্ত্রাদি নির্ধারিত সময়ে আগেই অকেজো হয়ে পড়ে। আর তাতে আবার নতুন করে ক্রয় করতে গিয়ে দুর্নীতি করার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফ নিয়োগেও চলে ব্যাপক দুর্নীতি।এতে দিনদিন বাংলাদেশ বিমান অদক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার এ পরিণত হয়েছে। গ্রাউন্ড সার্ভিস বিল বাবদ বিভিন্ন এয়ারলাইন্স হতে প্রতিদিন ফ্লাইট-টু-ফ্লাইট ভিত্তিতে লাখ লাখ টাকা বিল গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নে দেখা যায়, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স তাদের নিজস্ব লজিস্টিক সাপোর্টের মাধ্যমে গ্রাউন্ড সার্ভিসের অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করে থাকে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চুক্তি অনুযায়ী এয়ারলাইন্সগুলোকে ন্যূনতম সেবাও দিতে পারে না। এতে বহু বিদেশী এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে অপারেশন পরিচালনা করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে ঢাকায় তাদের অপারেশন বন্ধ করে দিয়েছে।
বিমানের ক্রয় ও লিজের পছন্দের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজস করে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিচ্ছেন কতিপয় বোর্ড পরিচালক। বিমান ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটায় নামে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়ে থাকে। বিমানের বোর্ড পরিচালক ও কর্মকর্তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য তাদের পছন্দসই প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নিয়োগ করে কার্যাদেশ প্রদান দিয়ে থাকেন। বারবার দুর্নীতি করতে উচ্চমুল্যে নিুমানের ইকুইপমেন্ট কিনছেন তারা। গ্রাউন্ড সার্ভিসের নামে লাখ লাখ টাকা বিল করা হলেও বিমান বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী এয়ারলাইন্সগুলোকে নূন্যতম সেবাও দেয়া হয়নি। এসব দুর্নীতির কারণে বহু বিদেশি এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে তাদের ফ্লইইট পরিচালনা করতে চায় না। ফলে ইতিমধ্যে অনেক এয়ারলাইন্স ঢাকা থেকে তাদের অপরাশেন বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া টিকেট বিক্রি, কার্গো আমদানি রফতানি বিমান ফুড ক্যাটারিংসহ আরও বেশ কিছু খাতে বড় রকমের দুর্নীতি হচ্ছে। সিভিল এভিয়েশনের অধিকাংশ ইঞ্জিনিয়ারের বিদেশে একাধিক বাড়ি রয়েছে মর্মে অভিযোগ রয়েছে। কাগজপত্র ঠিক রেখে কাজের কোয়ালিটি কমপ্রোমাইজ করে যেনতেনো কাজের মাধ্যমে ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। দু’একজন ভালো সৎ ইঞ্জিনিয়ার থাকলেও অসৎদের দাপটে তারা প্রমোশন ও যথাযথ পদায়ন বঞ্চিত। অন্যদিকে ভালো ঠিকাদার কর্তৃক দায়েরকৃত টেন্ডার থেকে প্রায়শ প্রয়োজনীয় এক বা একাধিক কাগজ গায়েব করে দিয়ে টেন্ডার বাদ দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ওই টিমের করা প্রতিবেদনটি রোববার দুদকের কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর কাছে হস্তান্তর করেন। এতে দুর্নীতির ১৯টি উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের জন্য তা প্রতিরোধের জন্য ১৯ দফা সুপারিশ করে দুদক। দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও ভারপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরীর সই করা প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। এতে বলা হয়, এসব দুর্নীতির লাগাম টেনে না ধরলে এই প্রতিষ্ঠানটি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগে ১৯ ধরণের দুর্নীতির উৰস চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আটটি খাতে মোটা অংকের দুর্নীতি হয় বলে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি সেবা প্রদানের প্রক্রিয়াকে পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে ঘুষ-দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রিতা এবং জনহয়রানি বন্ধে দুর্নীতি কমিশন গঠিত টিম এ প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনে প্রস্তাব পেশ করেেেছ।