এভিয়েশন নিউজ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিদের্শে হাজি ক্যাম্পে আটকেপড়া ৪৩৫ জন হজযাত্রী বিনামূল্যের টিকিট নিয়ে সুযোগ পেলেন হজে যাওয়ার। সউদিয়া এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সে’র শেষ পর্যায়ের কয়েকটি হজ ফ্লাইট যোগে এসব হজযাত্রী হজে গেলেন।
গতকাল বেলা ২টার দিকে সরকারি উদ্যোগে সানজুরি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মাধ্যমে সউদিয়ার হজ ফ্লাইটের ক্রয়কৃত ১৭৪টি টিকিট হাজি ক্যাম্পে পৌঁছলে প্রতারিত পুরুষ-মহিলা হজযাত্রীরা টিকিট নেয়ার জন্য কাউন্টারে হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
হাজি ক্যাম্পের ফ্লোরে বিমানের টিকিট ও পাসপোর্টের জন্য এক সপ্তাহ যাবত অপেক্ষা করে অনাহার-অনিদ্রায় দিন কাটান এসব হজযাত্রী। সউদিয়ার হজ ফ্লাইটের টিকিট সহকারী হজ অফিসার আব্দুল মালেকের রুমে এসেছে এমন খবর পেলে হজযাত্রীদের মাঝে ছোটাছুটি শুরু হয়। এসময় কেউ কেউ শুকনো খাবার খাচ্ছিলেন। টিকিট আসার খবর শুনে তারা ছুটে যান কাউন্টারে।
হাজী ক্যাম্পে কর্তব্যরত স্কাউট সদস্যরা বাঁশি ফুঁকিয়ে হজযাত্রীদের লাইনে দাঁড়া করান। সহকারী হজ অফিসার মোঃ আব্দুল মালেক গতকাল স্বারক নং ৭/১২৪/২০১৪ এক চিঠিতে বিমানের ভারপ্রাপ্ত সিইও এবং এমডিকে হাজি ক্যাম্পে আটকেপড়া ৩০০ হজযাত্রীকে সউদী আরবে পাঠানোর লক্ষ্যে টিকিট ইস্যুর জন্য ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকার পে-অডার্র সউদিয়া এয়ারলাইন্সে’র কান্ট্রি ম্যানেজারের কাছে প্রেরণের অনুরোধ জানান।
সোমবার দুপুর পর্যন্ত ৭৩ জন হজযাত্রী সউদিয়ার হজ ফ্লাইট যোগে জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছে। সউদী আরব থেকে কয়েকটি এজেন্সি’ চাপের মুখে আরো ১২০টি সউদিয়ার টিকিট কিনে দেশে পাঠিয়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ গতকাল সোমবার ইনকিলাবকে বলেন, সরকার হাজি ক্যাম্পে প্রতারণার শিকার অসহায় সকল হজযাত্রীকে টিকিট কিনে হজে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। হাজি ক্যাম্পে আটকেপড়া একজন হজযাত্রীও দেশ থাকবে না বলে উপ-সচিব উল্লেখ করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হজ এজেন্সি আল-নাঈম ইন্টারন্যাশনালের (২৩) মালিক আব্দুর রব ও তার ছেলে হজ এজেন্সি আল আসফাক-(৩৫৬) এর ৫৯ জন হজযাত্রীর হজের পুরো টাকা নিয়ে সউদী আরবে পালিয়ে গেছে।
প্রতারণার শিকার এসব হজযাত্রীদের হজ ভিসাযুক্ত পাসপোর্ট খিলক্ষেত দক্ষিণ নামাপাড়াস্থ বাসার আলমিরায় তালা দিয়ে গা-ঢাকা দেন আব্দুর রবের স্ত্রী। গত ২৮ সেপ্টেম্বর আল-নাঈম ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজার প্রতারক ইকবাল ও তার অপর সহকারী হযরত শাহজালাল(রহ.) আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সউদী আরবে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রতারণার শিকার হজযাত্রী রায়হান হযরত আলী, মহির প্রমাণিক, আব্দুর রাজ্জাক, বিমানবন্দরে ওঁত পেতে থেকে প্রতারক ইকবাল ও তার সহকারীকে হাতে নাতে ধরে উত্তম মধ্যম দিয়ে খিলক্ষেত থানা পুলিশে সোর্পদ করে।
থানা পুলিশ প্রতারক ইকবালকে নিয়ে আল-নাঈমের প্রতারক মালিক আব্দুর রবের বাসার তালা ভেঙে আলমিরা থেকে ৪২টি পাসপোর্ট উদ্ধার করে হজ অফিসে জমা দেয়। সরকার এসব হজযাত্রীদের তালিকা করে সউদীয়ার হজ ফ্লাইট যোগে সউদী আরবে পাঠাচ্ছে। ইউনিভারসেল হজ এজেন্সির ৭৭জন হজযাত্রীর হজের টাকা নিয়ে প্রতারক মালিক ও গ্রুপ লিডার গা-ঢাকা দেয়। টংগির হজযাত্রী সিরাজুল ইসলাম, যশোরের মোঃ দাউদ আলী মোড়ল, শিবচারে আব্দুর রাজ্জাক এতথ্য জানান।
পল্লবী থানা পুলিশ উক্ত এজেন্সির অফিসে অভিযান চালিয়ে এসব হজযাত্রীর পাসপোর্ট উদ্ধার করে। সরকার এসব হজযাত্রীকে সউদিয়ার টিকিট কিনে গতকাল হজে পাঠিয়েছে। মনির ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের (১০৪৯) মালিক হাসেম জামালপুরের হযরত আলী, রৌমারী থানার মোফাজ্জাল হক, রফিয়াল ইসলাম, নবাব আলীসহ বেশ কিছু হজযাত্রীর টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে। হুমায়রা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস (৮২৮) প্রতারক মালিক জাকির হোসেন ৩৪জন হজযাত্রীর টাকা নিয়ে সউদী আরবে পালিয়ে গেছে।
এসব হজযাত্রী কয়েক দিন যাবৎ হাজি ক্যাম্পে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। হজযাত্রী দৌলত ভূইয়া, আব্দুল হাসিম, আব্দুস সালাম আল-আমিন, আশাদ মিয়া, বিল্লাল হোসেন, তার মা আতরের নেসা গতকাল হাজি ক্যাম্পে কান্না জড়িত কণ্ঠে এ অভিযোগ করেন। প্রতারণার শিকার এসব হজযাত্রীকে সরকারি উদ্যোগে টিকিট সংগ্রহ করে হজে পাঠানো হচ্ছে।
আল-মাগফিরাহ ট্রাভেলসের হজযাত্রী আবদুল মালেক মানিক তার স্ত্রী হাসনা খানম, শাহজাহান ও মাহমুদ হোসেন জানান, প্রতারক হজ এজেন্সির মালিক হজযাত্রীদের ফ্লাইট দেই দিচ্ছি বলে পালিয়ে গেছে। তারা বলেন, কয়েকদিন যাবত হাজি ক্যাম্পে আমরা কান্নাকাটি করে দিন কাটাচ্ছি। সরকার আটকেপড়া অসহায় হজযাত্রীদের টিকিটের ব্যবস্থা করে হজে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়ে একটি বড় মহতি কাজ করেছে। তারা প্রতারক হজ এজেন্সির মালিক ও গ্রুপ লিডারদের অবিলম্বে গ্রেফতারপূর্বক তাদের লাইসেন্স বাতিল করার জোর দাবি জানান।
আকবর হজ গ্রুপের অহি ট্রাভেলস এজেন্টের হজযাত্রী বরগুনার লুৎফর রহমান, আব্দুল গনি সিকদার, সিরাজুল ইসলাম ও নাজেম আলী জানান, ১৫ জন হজযাত্রীর পুরো হজের টাকা নিয়ে প্রতারক মালিক গা-ঢাকা দিয়েছে। তারা নিরূপায় হয়ে সরকারি উদ্যোগে হজে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আবুল কালাম আজাদ ও সহকারী হজ অফিসার আব্দুল মালেক জানান, বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে প্রতারিত হজযাত্রীদের হজে পাঠাতে সরকার আন্তরিক।
সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশে হাজি ক্যাম্পে আটকেপড়া সকল হজযাত্রীকে সউদিয়া হজ ফ্লাইটের মাধমে হজে পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৪৭০জন আটকেপড়া হজযাত্রীর টিকিট সরকারি অর্থে ক্রয় করা হয়েছে। আটকেপড়া হজযাত্রীদের তালিকার অতিরিক্ত ৩৪টি হজ টিকিট ক্রয় করা হয়েছে। রাতে কেউ হাজি ক্যাম্পে চলে এলে তাদেরকেও সউদিয়ার হজ ফ্লাইট যোগে সউদীতে পাঠানো হবে।
যেসব হজ এজেন্সি হজযাত্রীদের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে হজযাত্রী নিয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে বলে ঐ কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন। যেসব হজ এজেন্সির প্রতারণা ও জালিয়াতির কারণে হাজি ক্যাম্পে শত শত হজযাত্রী আটকা পড়েছিল তা’ হচ্ছে ইউনিভারসেল ট্রাভেলস, আল-নাঈম এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আল-আসফাক, সাদেক ট্রাভেলস, হুমায়রা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, খাদেমুল হারামাইন সার্ভিস, আল-মাগফেরাত ট্রাভেলস, অহি ট্রাভেলস এজেন্ট, আল-আসফাকো ইন্টারন্যাশনাল, মুসলিম ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, নাজাত হজ ট্রাভেলস, হাজি হাফেজ ট্রাভেলস, ফ্লাইট রোজ ট্রাভেল, ফোর স্টার ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস এজেন্টস, এয়ার ওয়েব ইন্টারন্যাশনার ট্রাভেলস ও সুহাইল এয়ার ইন্টারন্যাশনাল।
সরকারি অর্থে তাৎক্ষণিকভাবে উল্লেখিত হজ এজেন্সির প্রতারিত হজযাত্রীদের টিকিট ক্রয় করে তাদের হজে পাঠানো হয়েছে। প্রতারিত এসব হজযাত্রীদের টিকিট ক্রয় করে হজে পাঠাতে হজ অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হিমসিম খেতে হয়েছে। এদিকে, হজযাত্রীর নামে সউদী আরবে চাকরি সন্ধানকারী হিসেবে বদরপুর ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস (১৭২)-এর ৬ জনকে পাসপোর্ট ও টিকিট সরবরাহ করা হয়নি।
এরা হচ্ছে চট্টগ্রামের মোঃ জাভেদ, আমিনুল হক, সাদেকুর রহমান, আব্দুর শুক্কুর, জালাল উদ্দিন ও অজ্ঞাত ব্যক্তি। বদরপুর ট্রাভেলসের মালিক মাওলানা মু’তাসিম বিল্লাহ গতকাল এতথ্য জানান। তিনি বলেন, এসব প্রতারক চক্র হজে গিয়ে সউদী থেকে আর দেশে ফিরতো না । এছাড়া মোক্তার ইন্টারন্যাশনাল হজ এজেন্সির মালিক আবু সাঈদ গতকাল সউদী আরবে থেকে টেলিফোনে জানিয়েছেন, ডেমরার গ্রুপ লিডার প্রতারক জাহাঙ্গীর আলম দুজন হজযাত্রী আব্দুল কাদের ও মোশারফ হোসনকে সউদীতে হজের নামে ৮ লাখ টাকা নিয়ে নো-ব্যাক হিসেবে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। গত ৩ সেপ্টেম্বর উল্লেখিত কাদের ও মোশারফ হোসেনকে ঢাকা বিমান বন্দর থেকে আটক করে থানা পুলিশে দেয়া হয়। প্রতারক গ্রুপ লিডার জাহাঙ্গীর আলম এখনো ৪ লাখ টাকা বাকি রেখে সউদীতে চলে গেছে।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে সউদিয়া এয়ারলাইন্সের সর্বশেষ হজ ফ্লাইট (এস ভি-৫২০৫) ৪৫০জন হজযাত্রী নিয়ে জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। সোমবার দুপুর পর্যন্ত দুটি এয়ারলাইন্স যোগে ৯৪ হাজার ৯৪২ জন হজযাত্রী সউদী গেছেন। বিমানের ফিরতি হজ ফ্লাইট আগামী ৮ অক্টোবর জেদ্দা থেকে ঢাকায় পৌঁছার কথা রয়েছে।
