পানিতে ময়লা-দুর্গন্ধ, বিপাকে রাজধানীবাসী

Water_011459166648কথায় কথায় বলা হয়, বিষয়টি পানির মতো সহজ। আসলে পানি কোনো সহজ বিষয় নয়। পানির অপর নাম যদি জীবন হয়, তাহলে দূষিত পানির আরেক নাম মরণ। দূষিত পানি জীবনকে কেমন দুর্বিসহ করে তোলে সেটা সবচেয়ে ভালো বোঝেন রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা।

গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী জুড়ে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ঢাকা ওয়াসা পানি সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে। যেটুকু পানি দিচ্ছে, তাতেও দুর্গন্ধ-ময়লা। ব্যবহারের অনুপোযোগী হওয়ায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। এ কারণে অনেকেই দুই-তিন দিন পর একবার গোসল করছেন। দূষিত পানি পান করার ফলে দিন দিন ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ বাড়ছে।
তবে ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, নগরবাসীর এ অভিযোগ সত্য নয়। ওয়াসার লাইন ফুটো করে চোরাই পথে পানি নেওয়ায় কোথাও কোথাও লাইনে বড় ধরনের ফাটল থাকে। তা দিয়ে ময়লা-আবর্জনা ঢুকে এমন সমস্যা দেখা দেয়। অভিযোগ আসার সাথে সাথেই তা ঠিক করে ফেলা হয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে- রাজধানীর মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার, রামপুরা, নাখালপাড়া, ধানমন্ডি, মানিকনগর, গোপীবাগ, টিকাটুলী, অভয় দাস লেন, কে এম দাস লেন, স্বামীবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ওয়ারি, শশী মোহন বসাক লেন, বনগ্রাম, মৈশুন্ডি, খিলগাঁও, বাসাবো, তিলপাপাড়া, গোড়ান, মেরাদিয়া, সিপাহীবাগ প্রভৃতি এলাকায় পানিতে ময়লা এবং দুর্গন্ধ দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি না পাওয়ায় এসব এলাকার বাসিন্দাদের খাওয়া-দাওয়া, অজু-গোসলসহ প্রাত্যহিক কাজে দুর্ভোগে পড়তে হয়। বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহারের পরও পানিকে ব্যবহার উপযোগী করা যাচ্ছে না।

ধানমন্ডির সোহেল বলেন, ‘ভাড়াটিয়ারা শুধু অভিযোগ করেন। পানি সমস্যার কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে অনেকেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চান। অজু-গোসল করা যায় না। পানিতে দুর্গন্ধ। রোগ-বালাই বেড়ে যাচ্ছে। অভিযোগ করেও কোনো কাজ হয় না।’

রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা রহমান খান বলেন, ‘পানি সমস্যা এক দিনের না। প্রায় সবসময়ই আমরা এ সমস্যায় ভুগি। এখন ড্রেনের পানিতে যেমন দুর্গন্ধ, লাইনের পানিতেও ঠিক একই দুর্গন্ধ। পানির লাইনে সুয়ারেজের ময়লা আসে। তাই লাইনের পানি ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছি। জারের পানি কিনে খাই। গোসল করি দুই দিনে একবার।’

ওয়াসা সূত্র জানায়, পানি সংকটের অন্যতম কারণ হলো- বর্তমানে রাজধানীতে ওয়াসার পানি সরবরাহ লাইনে সংস্কার ও অধুনিকায়ন কাজ চলছে। এজন্য চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। এতে অনেক এলাকায় পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহে পানির সংকট আরো বেড়ে গেছে। এ ছাড়া চোরাই পথে ওয়াসার পাইপ ফুটো করে বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে পানির লাইন সংযুক্ত করার পর সে স্থানে ভালো করে জোড়া লাগানো হয় না। এসব ফুটো দিয়ে ময়লা-আবর্জনা লাইনে গিয়ে পানি নষ্ট করে। এ কারণেই পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা দেখা দেয়।

রাজধানীবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘক্ষণ ফুটিয়েও ওয়াসার পানি দুর্গন্ধমুক্ত করা যায় না। ময়লা থাকায় তা আরো ঘোলাটে হয়ে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়েই তাদেকে বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে খরচ পড়ে বেশি।

পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াসা শতকরা ২২ ভাগ পানি ঢাকার আশপাশের নদী থেকে সংগ্রহ করে থাকে। এক্ষেত্রে গ্রীষ্ম মৌসুমে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এতই দূষিত থাকে যে, তা সঠিকভাবে বিশুদ্ধ করা হয় না। এ ছাড়া পানি বিশুদ্ধ করতে অনেক সময় ওয়াসা অতিমাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকে। এ কারণে পানিতে গন্ধ পাওয়া যায়।

পানি সরবরাহের বিষয়ে ঢাকা ওয়াসা বলছে, বর্তমানে রাজধানীর পানি সরবরাহ লাইনের সংস্কারের কাজ চলছে। এ কাজ পুরোপুরি শেষ হলে রাজধানীবাসী দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাবে। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার পানি ব্যবস্থাপনায় অনেক উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে দৈনিক ২২৫ কোটি লিটার পানির চাহিদার বিপরীতে ২৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ দিকে গত ৫ মার্চ মুগদাবাজার ওয়াসা গলিতে `জনপ্রতিনিধি-জনতার মুখোমুখি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনও অভিযোগ করেন, ওয়াসার পানির কারণে নগরবাসীর জীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে। পানিতে ময়লা-আবর্জনা পাওয়া যাচ্ছে।
মেয়রের এ অভিযোগ প্রত্যাখান করে ওয়াসার জনসংযোগ দফতর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা ওয়াসা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে পানি সরবরাহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমান নগরবাসীর দৈনিক পানির চাহিদা ২২৫ থেকে ২৩০ কোটি লিটার হলেও ওয়াসার সরবরাহ ক্ষমতা ২৪৫ কোটি লিটার। আর ওয়াসা কখনোই ময়লা বা দূষিত পানি সরবরাহ করে না। যে ২২ ভাগ নদীর পানি সরবরাহ করা হয় তা পরিশোধিত এবং দূষণমুক্ত করেই সরবরাহ করা হয়।

কোথাও কোথাও পানি ও সুয়ারেজ লাইন একত্রিত হয়ে সুয়ারেজের ময়লা পানির লাইনে গিয়ে পানি দুষিত করছে। নগরবাসীর এমন অভিযোগের বিষয়ে ওয়াসা বলছে, ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন মাটির বেশ নিচে স্থাপিত এবং তা পানির লাইনের সাথে মিশে যাবার কোনো সুযোগ নেই। দুটোই আলাদা-আলাদাভাবে নিরাপদ দূরত্বে রয়েছে। তবে গ্রাহকের অসচেতনতার কারণে পানি দূষিত হতে পারে। পানির লাইনে কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা জানামাত্র সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে থাকে ওয়াসা।

বিশুদ্ধ পানি সংকটের বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা বিশুদ্ধ করেই নগরবাসীর কাছে পানি পৌঁছায়। প্রতিদিন ওয়াসার লাইন কেটে চোরাই পথে সংযোগ নেয় অনেকেই। লাইন ফুটো করার কারণে পানিতে ময়লা প্রবেশ করছে। এ কারণে পানিগুলো লাইনে যাওয়া পর তার গুণগত মান কিছুটা হারায়। এক্ষেত্রে আমরা লাইনের পানিকে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে পান করতে অনুরোধ করছি।’

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.