ভেলোরে আটকেপড়া বাংলাদেশিদের মানবেতর জীবন

দক্ষিণ ভারতের ভেলোরে বিখ্যাত ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ বা সিএমসিতে মেয়ের অপারেশনের জন্য গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার বাসিন্দা স্বপ্না খাতুন। ২৮ ফেব্রুয়ারি সেখানে পৌঁছালেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে অপারেশনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার আগেই ভারতজুড়ে শুরু হয় লকডাউন। ফলে তার মেয়ের চিকিৎসাও আটকে যায়। আর এখন তিনি দেশেও ফিরতে পারছেন না।

ভেলোরের সায়েদাপেট এলাকার ২৮/১ কনার সড়কে মালার গান্ধী গেস্ট হাউসে আটকে পড়েছেন বাংলাদেশি অন্তত ৩০টি পরিবার। তারা মোবাইল ফোনে বর্তমান দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। তাদেরই একজন পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পৌরসভার বাসিন্দা অনন্ত মুখার্জি। ১০ মার্চ স্ত্রী ও দুই ভাতিজাসহ তিনি সেখানে পৌঁছান। তার ভাতিজা বরিশালের বাখেরগঞ্জ রত্না আমিন ডিগ্রি কলেজের ইংরেজির শিক্ষক অসীম মুখার্জি। এই ভাতিজা মোটরবাইক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। চিকিৎসা শেষে ২৪ মার্চ হাসপাতাল থেকে নাম কেটে দিলেও তারা এখন দেশে ফিরতে পারছেন না। ওই দিন রাতেই ভারতজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। লকডাউন ঘোষণার সময় এই হাসপাতালের আশপাশে অসংখ্য গেস্ট হাউস ও আবাসিক হোটেলগুলোতে অন্তত ১০ হাজারের মতো বাংলাদেশি ছিলেন। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ এক হাজারের মতো নানা প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরতে পারলেও বাকি বাংলাদেশিরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে দিল্লি ও মুম্বাইতে তাদের দুটি হটলাইন নম্বর দিয়ে আটকেপড়া নাগরিকদের জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে আটকেপড়া বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, দিল্লি হাইকমিশন এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের মুম্বাইয়ের অফিসে তারা একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাননি। অভিযোগকারীদের একজন অনন্ত মুখার্জি জানিয়েছেন, মুম্বাই অফিসের শাহীন চৌধুরীর (৯৬৫৩২১৩৯৮৪) ফোন নম্বরে তারা গত কয়েকদিন অন্তত অর্ধশতবার কথা বলেছেন। শাহীন চৌধুরী তাদের জানিয়েছেন, সরকারের তরফে কোনো উদ্যোগ নেই। তাই তারা কিছুই করতে পারছেন না। ভেলোরের সায়েদাপেট এলাকার আরেকটি গেস্ট হাউস সাই তুলসী। এখানে আটকা পড়ে আছেন নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার গন্ধবাড়িয়ার বাসিন্দা তামজেদুল ইসলাম। ১৯ মার্চ তার চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরে তিনি অন্তত পাঁচ-সাতবার রেলের টিকিট কেটেছেন। কিন্তু যাত্রা বাতিল হওয়ার কারণে প্রতিবার তার ৮০০ টাকা করে কেটে রেখেছে। তিনি বলেন, এখন তার অভুক্ত থাকার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বিমানে যাওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি তার নেই।

ময়মনসিংহের গৌরীপুরের সুদর্শন সরকার ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। তিনি জানান, সঙ্গে নেওয়া টাকাপয়সা ইতোমধ্যে শেষ। চিকিৎসার পেছনে খরচ বন্ধ রেখে এখন তাদের তিন বেলা খাওয়াই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আটকেপড়াদের জন্য খাবার সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কোনোদিনই তিন বেলা দেওয়া হয় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানান, খাদ্য সংকটে পড়ার খবর সত্য নয়। আটকেপড়াদের ফিরিয়ে আনতে সরকার শুরুতেই উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ওই সময়ে নিজ খরচে বিমান ভাড়া দিতে হবে- এই ভয়ে অনেকে নিজেদের নাম নিবন্ধন করেননি। আব্দুল মোমেন আরও বলেন, আটকেপড়াদের দেশে ফেরাতে ইউএস বাংলার ছয়টি ফ্লাইট চেন্নাই থেকে, কলকাতা থেকে দুটি এবং বাংলাদেশের বিমানের দুটি বিমান দিল্লি থেকে কাজ করছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আবারও নিবন্ধন শুরু করার কথা জানান তিনি।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.