এভিয়েশন নিউজ রিপোর্ট : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক পাইলট, বাংলাদেশ বিমান বাহীনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার (বীর প্রতিক) করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। তার শাররীক অবস্থা অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকার স্প্যাসালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বুধবার তার চিকিৱসার জন্য একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন জরুরী ভিত্তিতে তার ও পজেটিভ প্লাজমা প্রয়োজন।
তার সংগে যোগাযোগের নম্বর, কাজী রন, ০১৭৫১৪৪৪৯৯৭
আলমগীর সাত্তারের জন্ম মাদারীপুর জেলার কালকিনী উপজেলার গোপালপুর গ্রামে। তার বাবার নাম কাজী আবদুর রউফ এবং মায়ের নাম নূরজাহান বেগম। তার দুই স্ত্রীর নাম তাহমিনা সাত্তার ও সাইদা সাত্তার। প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন। তাঁদের দুই মেয়ে, দুই ছেলে।
আলমগীর সাত্তার বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সে (পিআইএ) যোগদানের অপেক্ষায় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মে মাসে ঢাকা থেকে পালিয়ে ভারতে যান। সেখানে মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। কিন্তু স্থলযুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। পরে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় মুক্তিবাহিনীর বিমান উইংয়ে। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বিমানের বৈমানিক হিসেবে যোগ দেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার
ঘন বৃক্ষরাজিতে পূর্ণ এক পাহাড়ি এলাকায় ডাকোটা বিমান নিয়ে নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আলমগীর সাত্তার। স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ রপ্ত করে রাতের আঁধারে আধুনিক দিকদর্শন যন্ত্র ছাড়াই বিমান চালনা এবং শত্রুর রাডার ফাঁকি দিয়ে মাত্র ২০০ ফুট উচ্চতায় বিমান নিয়ে উড়ে যাওয়ার কৌশল জানতেন ক্যাপ্টেন সাত্তার।
আরও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কেমন করে শত্রুবিমানের আক্রমণ মোকাবিলা করতে হয়, কত দূর থেকে রকেট ছুড়তে হয়, কীভাবে নিশানা লক্ষ্য করে বোমা ফেলে কত কোণে ডাইভ দিতে হয়, বিমানে থাকা মেশিনগান থেকে কীভাবে নিশানা স্থির করে গুলি ছুড়তে হয় ইত্যাদি।
প্রশিক্ষণ শেষে আলমগীর সাত্তার অপেক্ষা করতে থাকেন অভিযানে যাওয়ার জন্য। প্রশিক্ষণ স্বল্পমেয়াদি হলেও বিমান নিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তিনি উদগ্রীব। তিনি ডাকোটা বিমান নিয়ে আক্রমণ করবেন। এই বিমান নিয়ে আক্রমণ পরিচালনার জন্য মনোনীত হয়েছেন আরও দুজন—আবদুল মুকিত ও আবদুল খালেক। সিদ্ধান্ত হয়েছে, তারা তেজগাঁও বিমানবন্দরে আক্রমণ চালাবেন।
সবকিছু ঠিকঠাক। হঠাৎ তাঁদের মিশন বাতিল হলো। মিশন বাতিল করার কারণ, ওই বিমানে ব্যবহূত জ্বালানি। অকটেন ১০০ এই বিমানের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হওয়ায় ইঞ্জিনের পেছন দিয়ে যে ধোঁয়া বের হয়, তাতে অগ্নস্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি করে। রাতের আঁধারে অনেক দূর সেই অগ্নস্ফুলিঙ্গ দৃষ্টিগোচর হয়। এই অগ্নস্ফুলিঙ্গের কারণে বিমান শত্রুদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। তাই এই বিমান দিয়ে সামরিক অভিযান বাতিল করা হলো।
ডাকোটা বিমান দিয়ে ঢাকায় সামরিক অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে আলমগীর সাত্তার ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে অভিযান তিনি করতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি তার ওপর প্রদত্ত অন্য দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। ডাকোটা বিমান পরে মুক্তিবাহিনীর পরিবহন বিমান হিসেবে ব্যবহূত হয়। এ বিমান মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন দুর্গম ঘাঁটিতে চলাচল ও অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানী এই বিমানে করে বিভিন্ন রণাঙ্গণ পরিদর্শনে যেতেন।
মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকারও দুইবার ওই বিমানে রণাঙ্গণ পরিদর্শন করেন। তখন আলমগীর সাত্তার দক্ষতার সঙ্গে বিমান পরিচালনা করে তাঁদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যান।
বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার। ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি জানতেন না ঢাকায় কী ঘটতে চলেছে। সন্ধ্যার পর জিন্দাবাহার লেনের ক্যাপ্টেন আলমগীরের গাড়িতে তিনি সারা শহর ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। তারা দেখেছিলেন সারা শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে যে এমন গনহত্যা হতে পারে তা তাদের কল্পনাতেও ছিল না। রাতে তারা গিয়েছিলেন এলিফ্যান্ট রোডে ক্যাপ্টেন সিকান্দারের বড়িতে। সেখান থেকে বের হতে রাত এগারোটা বেজে গিয়েছিল। রাস্তায় বেড়িয়ে দেখলেন বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ক্যাপ্টেন সাত্তার বক্সিবাজারের বাসায় পৌছালেন পৌনে বারোটার দিকে। বাসায় গিয়ে যখন কেবল খেতে বসেছেন, তখনই গোলাগুলি শুরু হলো। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাবির সব হলগুলোতে নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করল, আর বস্তিগুলোতে আগুন দিল। সকালে উঠে দেখলেন অসংখ্য মানুষ দৌড়াচ্ছে। তখনও কারফিউ চলছিল। কিন্তু মানুষ তা উপেক্ষা করে প্রাণ ভয়ে ছুটছিল। সাহসে ভর দিয়ে ক্যাপ্টেন সাত্তার ইকবাল হল পর্যন্ত গিয়েছিলেন। সেখানে দেখলেন বেশ কিছু ডেড বডি।
এরপর তিনি ২৮ তারিখে সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতে যাবেন। কিন্তু যাওয়াটা সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত মে মাসের প্রথমদিকে আগরতলা পৌছালেন তিনি। সেখানে ক্যাপ্টেন সাত্তারসহ পিআইএর তিনজন পাইলট ছিলেন। তিনি বাদে অন্য দুজন হলেন ক্যাপ্টেন খালেক এবং ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন। এই তিন পাইলট রওয়ানা দিলেন দিল্লির দিকে। দিল্লিতে তারা মাস দেড়েক অবস্থান করেন। জুন মাসের শেষদিকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল পি সি লাল বুঝতে পারলেন এই যুদ্ধে বিমানবাহিনী একটা মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তখন ক্যাপ্টেন সাত্তারসহ তিনজন পাইলটকে ড্যাকোটা প্লেন চালোনোর অনুমতি দেওয়া হল।
তারা দিমাপুরে পৌছালেন সেপ্টেম্বরের এগারো তারিখের দিকে। এর দুই তিনদিনের মধ্যেই তাদের ট্রেনিং শুরু হলো। একটা ড্যাকোটা প্লেন, একটা অর্টার সিঙ্গেল ইঞ্জিন এবং একটা হেলিকাপ্টার ছিল তাদের সম্বল। প্রথমদিকে ড্যাকোটা প্লেনে চারজন পাইলট ছিলেন। তারা হলেন ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন, ক্যাপ্টেন সাত্তার এবং ক্যাপ্টেন মুকিত। অর্টারে ছিলেন ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন, ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ এবং ফ্লাইট লেঃ বদরুল আলম।
পাহাড়ের গিরিপথ দিয়ে ২০০ ফিটের নিচের উচ্চতা দিয়ে পুরনো দিনের ড্যাকোটা প্লেন চালানোর দায়িত্ব পড়েছিল ক্যাপ্টেন সাত্তার এবং অন্য পাইলটদের। বিষয়টা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কারণ একটা ইঞ্জিন নষ্ট হলেই সব শেষ হয়ে যেত।
আনুষ্ঠানিকভাবে বিমানবাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২৮ সেপ্টেম্বর। এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার তখন ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন, তিনি বিমানবাহিনী প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন সেদিন। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল পি সি লাল এবং এয়ার মার্শাল দেওয়ান। ২ নভেম্বর ক্যাপ্টেন সাত্তারসহ অন্য পাইলটরা দিমাপুর থেকে কৈলাশহর আসার পরিকল্পনা করেন।
এরপর রাত তিনটার দিকে তাদের ঢাকা আক্রমন শুরু করার কথা ছিল। তারা যখন কৈলাশহর যেতে প্রস্তুত, তখন তাদের কাছে একটা টেলেক্স পৌঁছে যায়। সেখানে নির্দেশ ছিল যে, তাদের ব্যারাকপুর যেতে হবে এবং আগের মিশন বাতিল হয়েছে। নির্দেশ মেনে তারা ব্যারাকপুর পৌছে যান।
ব্যারাকপুর যাওয়ার পর তাদের ৭/৮ বার প্লেন চালনা করতে হয়েছিল। এর মধ্যে জেনারেল ওসমানীকে নিয়ে ৪/৫ বার উড্ডয়ন করতে হয়েছিল পাইলটদের। জেনারেল ওসমানী আকাশপথে বালুরঘাট, গো হাটি, কুম্বিগ্রাম, শিলচরসহ বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন সাত্তারসহ অন্য পাইলটরা এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারকে নিয়েও দুইবার প্লেন চালনা করেছিলেন। এছাড়া বিমানযোগে তারা কলকাতার দমদম থেকে বালুরঘাটে ভারতীয় বাহিনীর কাছে অস্ত্র পৌছেও দিতেন। এরপর এই অস্ত্র চলে যেত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। শুধু এই একবারই নয়, আরও অনেকবার ক্যাপ্টেন সাত্তার এবং তার সহযোদ্ধারা বিভিন্ন ঘাটিতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবারহ করেছিলেন। *তথ্য সুত্র প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া