বিপাকে পডছেন সৌদি প্রবাসী কয়েক শত যাত্রী

সাউদিয়া এয়ারের আকস্মিক কোয়ারান্টাইন বাধ্যতামূক ঘোষণা করায় বিপাকে পডছেন কয়েক শত যাত্রী। গত দুদিনে সৌদিতে ফেরার অপেক্ষামান অন্তত পাচশত যাত্রী ফ্লাইট মিস করেছেন। তাদের অনেকের আবার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় চরম বিপাকে পড়েছে- যা হয়তো আর নাও ফেরা হতে পারে।

আবার অনেকেই না খেয়ে সারাদিন সাউদিয়ার কাউন্টারে দাড়িয়ে হোটেল বুকিংয়ের কাজ সেরেছেন। বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশি প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সৌদি সরকার। সৌদি আরব কর্তৃপক্ষের এ আকস্মিক সিদ্বান্তকে চরম হঠকারি ও অমানবিক বলে উল্লেখ করেছেন যাত্রীরা।

যাত্রীদের অভিযোগ করোনা সংক্রমণ রোধের প্রয়োজনে সৌদি কর্তপক্ষ কোয়ারান্টানের বাধ্যবাধকতার যে সিদ্বান্ত নিয়েছে সেটা অন্তত এক সপ্তাহ সময় বেধে দিয়ে দিলে করলে এ সংকট হতোনা। ওদের স্বেচছারিতা ও হঠকারিতার শিকার হয়েছে যাত্রীরা। প্রবাসীরা দুঃখ-“ একদিকে কোয়ারেন্টাইনের দ্বিগুণ খরচ, আরেকদিকে তথ্য বিভ্রাটের দরুণ এই সংকট। এতে অনেক যাত্রীই নিঃস্ব।

গতকাল শুক্রবার হজরত শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যার্য়- আটকে পড়া যাত্রীদের চরম বিশ্ঙৃখল ও হট্রগোল। একদিকে টিকেটের মেয়াদ শেষ হয়ে আসা অন্যদিকে কোয়ারান্টানের ব্যয়ের চাপে পড়ে তারা দিশেহারা। ঢাকা সৌদিতে ওয়ানওয়ে টিকেটের সর্বনিš§ ভাড়া যেখানে ৪৫ হাজার সেটার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও কমপক্ষে ৫৫ থেকে ৬৫ হাজার টাকার কোয়ারান্টান ব্যয়। সাতদিনের কোয়ারানান্টন খরচেও তাদের দুঃখ ছিলনা যদি সময় দেয়া হতো।

জানা গেছে-হঠাৎ বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশ থেকে ফিরতে হলে সৌদি আরব নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করে। এসব বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছে- যারা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নেননি, তাদের সৌদি আরবে প্রবেশ করলে সাত দিন হোটেলে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে হোটেল খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে।

সৌদি আরবে যাওয়ার আগের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পিসিআর পদ্ধতিতে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসলেই কেবল ঢাকা থেকে যাত্রীরা ফ্লাইটে উঠতে পারবেন। সৌদিতে পৌঁছানোর পর আরও দুই বার করোনা টেস্ট করতে হবে। প্রথমবার টেস্ট করতে হবে সৌদি আরবে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। এরপর কোয়ারেন্টাইনের ষষ্ঠ দিনে আবারও করোনা টেস্ট করা হবে।

করোনা টেস্ট করার খরচ যাত্রীকেই বহন করতে হবে। দুই বার টেস্টে নেগেটিভ রিপোর্ট এলে হোটেল কোয়ারেন্টাইন থেকে ৭ম দিনে নিজ বাসায় যাওয়া যাবে। এছাড়া যারা পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছে, তাদের ভ্যাকসিন নেওয়ার প্রমাণপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে ফাইজার-বায়োএনটেকের দুই ডোজ, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুই ডোজ, মডার্নার দুই ডোজ এবং জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার এক ডোজ যারা নিয়েছে, তারা হোটেলে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকার বদলে বাসায় কোয়ারেন্টাইনে থাকার সুবিধা পাবেন।

প্রথমবারের মতো সৌদি প্রবাসীকে সৌদি আরবে যাওয়ার আগে হেলথ ইন্স্যুরেন্স করতে হবে। করোনা হলে ইন্স্যুরেন্স প্রতিষ্ঠান তার চিকিৎসা ব্যয় বহন করবে- বিষয়টি ইন্স্যুরেন্সে স্পষ্ট থাকতে হবে। আদেশে বলা হয়, ভ্রমণ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিলে শাস্তি হিসেবে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

অন্যদিকে সিভিল এভিয়েশনের দেওয়া চিঠিতে করোনা নিয়ে সরকারি পাবলিক প্রসিকিউসন বিভাগের জারি করা একটি আদেশ হুবহু তুলে ধরা হয়। আদেশটিতে বলা হয়েছে, কেউ যদি করোনাভাইরাস ছড়ায় তাকে পাঁচ বছরের জেল এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করা হবে। যদি সেই ব্যক্তি প্রবাসী হয়, তবে তাকে শাস্তি দেওয়া পর সৌদি আরব থেকে বিতাড়িত করা হবে এবং সে আর কোনো দিন সৌদি আরবে আসতে পারবে না।

এহেন ঘোষণায় হঠাৎ যেন দেশে আটকা পড়া সৌদি প্রবাসীদের মাথায় যেন বাশ পড়ার মতো অবস্থা। এতে বুধবার রাতেই বিমান বাংলাদেশ ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা দেয়। তার একদিন পর সাউদিয়া এয়ারেরর যাত্রীদের জানানো হয় তথ্য। এতেই তথ্য বিভ্রাট দেখা দেয়ায় দেশে আটকে পড়া সৌদি প্রবাসীরা ঢাকায় যোগাযোগ ও যাতায়াত শুরু করে।

ভুক্তভোগী এসব যাত্রীদের দৃষ্টিতে-এই কোয়ারেন্টাইনের খরচ বিমানের টিকেটের চেয়ে বেশী।সৌদি সরকারের নেওয়া এমন সিদ্ধান্ত অমানবিক। শুধু এই একটি কারণেই বৃহস্পতিবার চার শতাধিক সৌদি প্রবাসী শ্রমিক টাকা না থাকায় এবং নিয়মমাফিক হোটেল বুকিং না করায় দেশটিতে ফিরতে পারেননি। তবুও তারা জরুরি হজরত শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমানবন্দরে গিয়ে হাজির হন এবং নিজের টিকেটের সাথে কোয়ারানাটানের টাকা পরিশোধ করে সৌদিতে হোটেল বুকিং দিতে শুরু করে। তবে অনেকেই একদিনের নোটিশে অতিরিক্ত এই ৬০/৬৫ হাজার টাকা যোগাড় করতে না পারায় বিপাকে পড়েন।

এমনই একজন বরিশালে মনির- যিনি শুধু এই অতিরিক্ত টাকা সংগ্রহ করতে না পেরে বিমানবন্দর থেকে সৌদির হোটেল বুকিং করতে না পেরে ফ্লাইট ধরতে পারেননি। একই পরিস্থিতির শিকার দাম্মাম প্রবাসী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন- চরম দুভার্গ্য।একটার পর একটা বিপদ।

আগামীকাল রবিবার আমার সাউদিয়ায় ফ্লাইট। কিন্তু আমি এখনও হোটেল বুকিং দিতে পারিনি। যেই ট্রাভেল এজেন্সি থেকে ফ্লাইট বুকিং করেছিলাম, তারা হোটেল বুক করতে পারবে না। কত টাকা লাগে কোথায় গিয়ে বুক করব কিছুই জানি না। বৃহস্পতিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়ার পর সেখান থেকে সাউদিয়ার সোনারগাঁও হোটেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

তবে তারা শুত্রবার ও শনিবাররে কিটধারীদের হোটেল বুকিং করায়। আথচ‘ আমারটা করায়নি। ঢাকায় এসে জানতে পারলাম কোয়ারেন্টাইন খরচ ন্যূনতম ৬৬ হাজার টাকার মতো (সর্বনিম্ন ২৯০০ সৌদি রিয়াল)। এখন একদিনের মধ্যে এত টাকা কীভাবে জোগাড় করব, সেটা বুঝতে পারছি না। শুধু আমার একার নয় –এমন অনেকেই বিপদে পড়েছেন।

দেখা গেছে আবার অনেকেই হোটেল বুকিং দিয়েও নতুন করে বিপাকে পড়েছেন। নাজিম খান নামে এক প্রবাসী বলেন- কি আর বলবো দুঃখের কথা। কপালের ফের। আমি রিয়াদে থাকি। পরিচিত একজনের পরামর্শে বুকিং ডটকম থেকে সাত দিনের জন্য ২৫ হাজার টাকা দিয়ে হোটেল বুকিং করেছিলাম। তবে সাউদিয়া জানাল, এই বুকিংয়ে কাজ হবে না। সৌদি সরকার কোয়ারেন্টাইনের জন্য হোটেল বুকিং করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে আমার অতিরিক্ত ৮০ হাজার টাকা খরচ হলো।

বিমানবন্দরে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়- গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার সৌদির ফ্লাইটে চড়তে পারেননি অনেক যাত্রী। সৌদি এয়ারলাইন্স জানায়, অনেকেই হোটেল বুকিং করেছেন। তবে তারা সৌদি আরবের অবস্থানকালীন মোবাইল নম্বর না দিয়ে বাংলাদেশের ফোন নম্বর দিয়েছেন। এতে বুকিং বাতিল হয়েছে।

অনেকে আবার সৌদি সরকারের নির্ধারিত হোটেলে বুকিং না দিয়ে ইচ্ছা মতো বুকিং করেছে। কেউ কেউ সৌদিতে তার পরিচিতদের ফোন করে হোটেল বুকিং করিয়েছে। এমন হলে তাদের সৌদি বিমানবন্দর থেকেই ফেরত দেওয়া হবে। তাই তাদের সোনারগাঁও হোটেলের কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে।অনেকেই ত্রুটিপূর্ণভাবে হোটেল বুকিং করাচ্ছে। এমন হলে আমরা তাদের ফ্লাইটে নিতে পারব না।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে-বিমানবন্দরে সৌদি এয়ারলাইন্সের কাস্টমার রিপ্রেজেন্টেটিভ মো. নাসিম আখতার গণমাধ্যমকে বলেন-অনেকেই ত্রুটিপূর্ণভাবে হোটেল বুকিং করাচ্ছে। এমন হলে আমরা তাদের ফ্লাইটে নিতে পারব না। ফ্লাইটে নিলেও লাভ হবে না, তাদের বিমানবন্দর থেকেই বাংলাদেশে ফেরত দেওয়া হবে।

তাই সুস্পষ্টভাবে বুকিংয়ের জন্য তাদের সোনারগাঁও কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে।
লক্ষীপুরের জসীম নামের একজন সোনারগাও হোটেলের সাউদিয়া এয়ারের কাউন্টারে দাড়িয়ে দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন- হঠাৎ খবর পেয়ে বাড়ি থেকে আসা।

খরচের তো শেষ নেই। সৌদি সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রবাসীকে সৌদি পৌঁছে নিজ খরচে একবার করোনা টেস্ট করতে হবে। কোয়ারেন্টাইনের ষষ্ঠ দিন আবার টেস্ট করাতে হবে। প্রতিবার ১২৯ সৌদি রিয়াল করে বাংলাদেশিদের দুই টেস্টে খরচ হবে প্রায় ৬ হাজার টাকা। প্রবাসীরা দেশে ফিরে টাকা নিয়ে। যাবার সময় ফিরে শুণ্য হাতে শুধু টিকেট নিয়ে।

দেশে ফিরে ছুটি শেষ হওয়ার সাথে টাকাও যখন শেষ হয়-তখনই তারা ফিরে। বেশীরভাগের বেলায়ই এমনটি ঘটে। কিন্তুু একদিনের নোটিশে যদি তাদেরকে বলা হয়- অতিরিক্ত ৬-/৬৫ হাজার লাগবে তখন তো দিশেহারা না হয়ে উপায় কি ?

টাঙ্গাইলের লুৎফর নামের জেদ্দা প্রবাসী বলেন- সৌদি সরকারের বিধিনিষেধ নিয়ে যদি আগে থেকে সঠিক সময়ে প্রচার বা ঘোষণা দেয়া হতো তাহলে একজন যাত্রীও ফ্লাইট মিস করতো না। শেষ মুহুর্তে খবর পেয়ে ঢাকায় এসে হোটেল বুকিংয়ের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচেছ।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.