পদে পদে হয়রানি রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে

রাজশাহী মহানগরীর পাসপোর্ট অফিসে গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে বায়োএনরোলমেন্ট প্রসেসিং রুমের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেবাপ্রত্যাশীদের বিশাল লাইন। যাদের অনেকেই বৃদ্ধ ও শিশু। দেখেই বোঝা যায়, কেউ কেউ অনেক অসুস্থ, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাবেন বলে এসেছেন পাসপোর্ট করতে।
নিচতলার ঐ রুমের (১০৩) দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দায়িত্বপালন করছিলেন আরএমপির কনস্টেবল শামিম। ডিউটির নামে লাইন ভঙ্গ করে কৌশলে তিনি তদবিরের ব্যক্তিদের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন আবেদনপত্র সহকারে।
কিছুক্ষণ পর পর পাসপোর্ট অফিসে দায়িত্বরত আনসার সদস্য নান্নু ও জাহাঙ্গীরও এসে পছন্দের ব্যক্তিদের ঐ কক্ষে কৌশলে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন। নয়তো রুমের দরজার পাশে লাইনের বাইরের ঠিক ডানের চেয়ারে পছন্দের লোকদের যত্নসহকারে বসিয়ে রাখছিলেন। এরপর সুযোগ বুঝে ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন। লাইনে দঁড়ানো মানুষগুলো এনিয়ে কিছু বললে তাদেরকে শাসিয়ে চুপ করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে বলছিলেন তারা।

এসব অনিয়ম দেখে শিশু নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সেবাপ্রার্থী আমিরুল হক একপর্যায়ে ঐ কক্ষের সামনে চিৎকার শুরু করেন। তার দাবি, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে তার মতো সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। পুলিশ, আনসার ও পাসপোর্ট অফিসের লোকেরা সিরিয়াল ভেঙে পছন্দের কিংবা দালালের লোকের ছবি ও ফিঙ্গার প্রিন্ট নিতে ঐ কক্ষে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি ঐ কক্ষে ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি তোলার দায়িত্বরত আঞ্জিবও এমন অনিয়মে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী আমিরুল জানান, মাঝে মাঝেই আঞ্জিবও দরজার সামনে এসে বাইরে থাকা পছন্দের বা তদবিরের মানুষকে কক্ষে ঢুকিয়ে নিচ্ছিলেন।

আমিরুলের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যদের দাবি, পাসপোর্ট অফিসে সেবাপ্রার্থীদের পদে পদে হয়রানি হতে হচ্ছে। আবেদন করতে গেলে আবেদনপত্রে ভুল আছে বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে চরম দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে। অথচ অফিসে হেল্প ডেস্ক থাকলে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি হয়ে ফিরে যেতে হতো না।
সেখানে বসেই আবেদনের কাজটি সারতে পারতেন। পাসপোর্ট প্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি দিলেই অফিসের উল্লিখিতরা দ্রুত কাজ করে দিচ্ছেন। অর্থাৎ বাড়তি টাকা দিলে সেবাগ্রহীতাদের কোনো প্রকার হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না।

এদিকে আমিরুলসহ একাধিক পাসপোর্ট-প্রত্যাশী জানান, পাসপোর্ট অফিসে দুর্ভোগের শুরু মো. আব্দুল ওয়াদুদের টেবিল থেকে। প্রথমে আবেদনপত্র তার হাতেই জমা পড়ে। এর পর তিনি নানা ছুতোয় ঐ আবেদনপত্র রিজেক্ট বা বাতিল করেন। তবে দেন না কোনো দিকনির্দেশনা। তার সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বললে তিনি একই আবেদনপত্র কৌশলে সংশোধনের পরামর্শ দেন। এ জন্য তাকে দিতে হয় বাড়তি টাকা।

পরিস্থিতি বিবেচনায় পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারী ওয়াদুদ, আঞ্জিব, আনসার সদস্য নান্নু ও জাহাঙ্গীর, পুলিশ সদস্য শামিমের মতো মানুষের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে আসা সেবাপ্রত্যাশীরা। এভাবেই বছরের পর বছর চলছে এই বিভাগীয় অফিস। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে উপ-পরিচালক কামাল উদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘অনেক সময় অনেক সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, র‍্যাব-পুলিশ ও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আসেন। তাদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। তাই তাদের আগে সুযোগ দেওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না।’

এসময় তার অফিসে কর্মরত আনসার সদস্য নান্নু ও জাহাঙ্গীর, পুলিশ কনস্টেবল শামিম এবং কর্মচারী ওয়াদুদ ও আঞ্জিবের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হলে তিনি তাদের ডেকে এনে মৌখিকভাবে শাসন করেন।

উপ-পরিচালক আরো বলেন, কেউ বাইরে কারো সঙ্গে অর্থ লেনদেন করেন, সেটা পাসপোর্ট অফিসের আওতার বাইরে। তবে তিনি পাসপোর্ট-প্রত্যাশীদের সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়া ব্যক্তি বিশেষকে অর্থ না দিতে অনুরোধ করেন।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.