বিশ্বজুড়ে বিমান খাত বর্তমানে ভয়াবহ পাইলট সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনদের একযোগে অবসরে চলে যাওয়ায় বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছে, যা বিমান পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ফ্লাইট সূচিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এয়ারলাইনস এখন দক্ষ ও অভিজ্ঞ পাইলট সংকট মোকাবিলায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) বাধ্যতামূলক অবসর নীতির কারণেই এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্সের পাইলটদের ৬৫ বছর বয়সে অবসরে যেতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এই জনবল সংকট এখন একসঙ্গে হাজারো অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনের অবসরের কারণে বড় আকার ধারণ করেছে।
করোনাভাইরাস মহামারি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০২০ ও ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক এয়ারলাইনস ব্যয় কমাতে সিনিয়র পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের আগাম অবসরের প্রস্তাব দেয়। হাজারো অভিজ্ঞ পাইলট সেই সুযোগ গ্রহণ করে স্থায়ীভাবে কর্মজীবন থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে এয়ারলাইনসগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই বহু বছরের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব হারায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনদের এই ঘাটতি এখন নতুন প্রজন্মের পাইলটদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ফার্স্ট অফিসারকে দ্রুত ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও সিনিয়রদের দিকনির্দেশনার অভাবে নিরাপত্তা ও বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ছে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন এয়ারলাইনস অবশিষ্ট অভিজ্ঞ পাইলটদের আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এতে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও মূল সংকটের সমাধান হচ্ছে না। বরং এক এয়ারলাইনস থেকে আরেক এয়ারলাইনসে পাইলট স্থানান্তরের প্রবণতা বেড়েছে, যা পুরো শিল্পে অস্থিরতা তৈরি করছে।
বিশ্বের বড় বড় এয়ারলাইনস জানিয়েছে, আগে যেখানে একজন ফার্স্ট অফিসারের ক্যাপ্টেন হতে ৮ থেকে ১০ বছর সময় লাগত, এখন সেই সময় বেড়ে ১২ থেকে ১৫ বছর বা তারও বেশি হচ্ছে। এতে তরুণ পাইলটদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং অনেকে পেশা পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু বেতন বাড়ানো বা নিয়োগ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। বিমান খাতকে দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণব্যবস্থা উন্নয়ন এবং অবসর নীতিমালার বাস্তবসম্মত সংস্কার নিয়ে ভাবতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
