মোসাদ্দিক আহম্মেদকে বিমানের এমডি থেকে অব্যাহতি

শামিম আহমেদঃ  মোসাদ্দিক আহম্মেদকে বিমানের এমডি থেকে অব্যাহতি।

ক্যাপ্টেন (অব.) মোসাদ্দিক আহম্মেদকে বাংলাদেশ বিমানের এমডি পদ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিমানের পরিচালণা পর্যদ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নতুন এমডি নিয়োগ না পাওয়া পর্যন্ত পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন ক্যাপ্টেন জামিল আহম্মেদ বিমানের এমডি হিসাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। পরিচালণা পর্যদ সুত্রে এই তথ্য জানাগেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পর্যদের একজন সদস্য বলেন, বিমানের এমডি হিসাবে ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহম্মেদ দক্ষ কর্মকর্তা ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুনীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অসংখ্য অভিযোগ রযেছে। এছাড়া তিনি এভিয়েশন সেক্টরের মার্কেটিং ও সেল্স সম্পর্কে দক্ষ ছিলেন না। তার আমলে বিমান বিপুল অংকের টাকা লোকসান দিয়েছে।

সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাইলট নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে। আর এই অনিয়ম-দুনীতির সঙ্গে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহম্মেদের সম্পৃক্ততা ছিল। একারণে তাকে বিমানের এমডি পদ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ নিয়োগের আগে বিমানের সর্বোচ্চ স্তর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নেয়া হয়নি।

প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স নির্ধারণে প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা দিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম মোসাদ্দিক আহমেদের ভাতিজাসহ কমপক্ষে ৩০-৩২ জন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে।

ভাতিজাকে নিয়োগ দিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এম  নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এমডি ডেলিগেশন অব পাওয়ারের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছেন। শুধু তাই নয়, পছন্দের প্রার্থী ও একটি গ্রুপকে অবৈধ সুবিধা দিতে বাছাই কমিটির আহ্বায়ককে না জানিয়ে পুরো নিয়োগের বাছাই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই পর্যদ সদস্য আরো বলেন, পর্যদ সভায় নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত এমডি ক্যাপ্টেন জামিল আহম্মেদের বিরুদ্ধেও পাইলট নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একারণে এই নিয়োগ নিয়ে এমডি হিসাবে তাকেই সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা পর্যদে আলোচনা হয়েছে। অন্যথা তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জানাগেছে পাইলট নিয়োগে অপারেশন ম্যানুয়েল পার্ট ‘এ’ অনুযায়ী নিয়োগের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা হয়নি। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা মানবণ্টন অনুযায়ী না করে মৌখিক পরীক্ষায় ৫০ শতাংশ নম্বর রেখে বিশেষ প্রার্থীদের সুবিধা দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিস্টরা বলেছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এবার দুর্নীতি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আরও কঠোরভাবে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। সরকারি কোনো দফতরে দুর্নীতি জনহয়রানি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না মর্মে প্রধানমন্ত্রী সুদৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন। সরকার গঠনের পরপরই সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। যে কারণে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও দফতরে যাতে দুর্নীতি হতে না পারে সে জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিশেষ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া হযেছে। এর অংশ হিসেবে বিমান এমডিকে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে বিমান মন্ত্রণালয়েও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন যারা দুনীতি করবে তাদের কাউকে ছাড়া হবে না।

সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে পাইলট নিয়োগে জড়িত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করে বলেন, পাইলট নিয়োগের এই গুরুতর অনিয়মসহ বিমানের বড় বড় সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে বিমান সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

পাইলট নিয়োগের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এ বছর পাইলট নিয়োগে মোট ১৩ ধরনের অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বিমান এমডি ক্যাপ্টেন (অব.) মোসাদ্দিক আহমেদের ভাতিজা মোক্তাদির আহম্মদকে সুযোগ দিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তাতে সংশোধনী এনে শিক্ষাগত যোগ্যতা হ্রাস করা। শিথিল বিজ্ঞপ্তির সুযোগে এমডির ভাতিজাসহ প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে বাতিল হওয়া ৩০ জনের আবেদন বৈধ হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ১৩ জন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কোম্পানির শূন্যপদে জনবল নিয়োগের আগে অনুমোদিত পদ, শূন্যপদ ও অর্থের সংস্থান বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করে নিয়োগের অনুমোদন নিতে হয়। পর্ষদ কোম্পানির কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে জনবল নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করে থাকে। কিন্তু এমডি পরিচালনা পর্ষদকে এ বিষয়ে কিছুই জানাননি। পর্ষদকে অন্ধকারে রেখে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানের অপারেশনাল ম্যানুয়েল অনুসারে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য নম্বর বণ্টন সুনির্দিষ্ট থাকলেও সিলেকশন কমিটি কেন এটি অনুসরণ করে সমন্বিত মেধা তালিকা তৈরি করেনি, তা বোধগম্য হয়নি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা সিলেকশন কমিটি এ নিয়ে কোনো যৌক্তিক ব্যখ্যাও দিতে পারেননি। এতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, সিলেকশন কমিটি কাউকে বা কোনো গ্রুপকে সহযোগিতা করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নিয়েছে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য সিলেকশন কমিটি ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার নম্বরকে ৭৫ শতাংশ এবং মৌখিক পরীক্ষার গৃহীত নম্বরকে ২৫ শতাংশ ধরে একটি তালিকা তৈরি করেছে। যে ৫৪ জন পাস করেছে তাদের ফলাফল পুনরায় প্রস্তুত করে দেখা গেছে কমপক্ষে ৫ জন প্রার্থীর ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ যে ৩২ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছিল সে তালিকা থেকে ৫ জন বাদ যায় এবং ৩৩-৩৭ তালিকায় থাকা প্রার্থীরা উপরে উঠে আসে। সমন্বিত তালিকা প্রস্তুতকালে ম্যানুয়েলে বর্ণিত বিধান অনুসরণ না করে কমপক্ষে ৫ জন প্রার্থীর প্রতি অবিচার করা হয়েছে।

৭৬ জন প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ ফলাফল বিবেচনা করা হলে অবিচারের তালিকা আরও দীর্ঘ হতো। নিয়োগের ক্ষেত্রে ৭৫ নম্বরের লিখিত এবং ২৫ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষার বিধান থাকলেও এই নিয়োগে তা মানা হয়নি। সংগঠনটির ওঅ্যান্ডএম এবং অপারেশনাল ম্যানুয়েল অনুসারে ক্যাডেট পাইলট পদের জন্য বয়স ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ বছর হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যবস্থাপনা পরিচালক যুক্তিহীনভাবে এ বয়স ৪০ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অনুমতি দেয়।

প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এমডির ভাতিজাসহ ৩০ জন প্রার্থী আবেদনই করতে পারতেন না। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি সংশোধন করে তাদের আবেদন করার সুযোগ করে দেয়া হয়। প্রার্থীদের আবেদন চার সদস্যের কমিটির মাধ্যমে বাছাই করার কথা থাকলেও করা হয়েছে তিন সদস্যের কমিটির মাধ্যমে। কমিটির আহ্বায়ককে বিষয়টি জানানোই হয়নি। মৌখিক পরীক্ষার সময় কমিটির সদস্য চিফ অব ট্রেনিং উপস্থিত ছিলেন না। ডেপুটি চিফ অব ট্রেনিংকে দিয়ে মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়। চিফ অব ট্রেনিং এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.