ভিসা দেওয়া শুরু হবে সকাল সাড়ে নয়টায়। কিন্তু রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা সারিতে দাঁড়িয়েছেন রাত তিনটায়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে কেউ খবরের কাগজ পেতে, কেউ মাদুর পেতে বসেন। সকাল নয়টার দিকে মাথার ওপর ওঠে কাঠফাটা রোদ। সেই খরতাপে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন অনেকে। রোগীদের মাথায় ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন স্বজনেরা।
রাজশাহীতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সামনের দৃশ্য এটি। প্রতিদিনই এই দৃশ্য দেখা যায়।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, সকালে এসে সারিতে দাঁড়ালেও ভিসা পাওয়া যায় না। সামনে কিছু লোক টানা হয়। আর পেছন থেকে দালালের মাধ্যমে কিছু লোক ভেতরে ঢুকে যায়। তারপর ১২টা বাজলেই কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়। অসুস্থ রোগীরা দিনের পর দিন এসে ফিরে যান। এ জন্য যাঁরা পারছেন তাঁরা রাতেই এসে সারিতে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কাউন্টার খোলা থাকে। তারপর যত মানুষই সারিতে থাকুক, কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
১৭ মার্চ সকাল ১০টায় ভারতীয় হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, প্রচণ্ড রোদের মধ্যে প্রায় ২০০ মানুষ দুই সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন। এক সারিতে নারী, আরেক সারিতে পুরুষ। প্রায় সবাই অসুস্থ। কারও কারও হাতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের ফাইল। কেউ ছাতা কেউবা ফাইল দিয়ে রোদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। খুব অসুস্থ রোগীদের জন্য সঙ্গে করে প্লাস্টিকের চেয়ার বা টুল আনা হয়েছে। অন্যরা মাটিতেই বসে পড়েছেন।
কুষ্টিয়ার চুয়াডাঙ্গা থেকে এসেছিলেন ইফতেখারুল ইসলাম (৬০)। তিনি বলেন, আগের দিন এসে এক মিনিটের জন্য তিনি ভেতরে ঢুকতে পারেননি। এ জন্য রাত আড়াইটায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তাঁর আগেও অনেকে লাইন দখল করেছেন।
রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া থেকে রাত তিনটায় এসে সারিতে দাঁড়ান মুক্তি রানী (৩৬)। তিনি ১৪ মার্চ সকাল আটটায়, ১৫ মার্চ সকাল সাতটায় ও ১৬ মার্চ ভোর পাঁচটায় এসেও ভিসা পাননি। বাধ্য হয়ে এদিন রাত তিনটায় এসেছেন। তারপরও ভিসা পেতে সকাল ১০টা বেজে যায়।
পুঠিয়ার ঝলমলিয়া থেকে আসা মতিউর রহমান (৫০) হৃদ্রোগে আক্রান্ত। টানা চার দিন ভিসার জন্য দিনের বেলা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সিরিয়াল আসার আগেই কাউন্টার বন্ধ হয়ে যায়। উপায় না দেখে এদিন ভোর পাঁচটায় লাইনে দাঁড়ান। তখন সকাল ১০টা। তাঁর সামনে ছিলেন আরও ১৫ জন। এদিনও তিনি ভিসা পেয়েছেন কি না শেষ পর্যন্ত জানা যায়নি।
দালালের মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার অভিযোগ যাচাই করার জন্য সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই দেখা গেল, এক যুবক একটি ভিসা হাতে নিয়ে ভেতর থেকে বাইরে এসে একজন মক্কেলকে বোঝাচ্ছেন, ‘আমার সঙ্গে সহকারী হাইকমিশনারের সম্পর্ক রয়েছে।’ হাতের ভিসাটা দেখিয়ে বলেন, ‘এক্ষুনি এটা করে নিয়ে আসলাম। সম্পর্ক থাকলে সব হয়। আমাকে বিশ্বাস করলে দায়িত্ব দিতে পারেন।’
যোগাযোগ করলে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় মুঠোফোনে বলেন, তাঁদের লোকবল কম। এ জন্য সমস্যা হচ্ছে। রাজশাহীতে আসার পর থেকেই তিনি চেষ্টা করছেন, মানুষের যেন কোনো কষ্ট না হয়। দালালদের ব্যাপারে তিনি বলেন, কেউ দালালকে চিনিয়ে দিলে তিনি তাকে ভেতরে ঢুকতে দেবেন না। এ জন্য তিনি সহযোগিতা চান।
দালাল আটক: র্যা ব-৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামল চৌধুরী বলেন, গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় তাঁরা রাজশাহীর ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সামনে অভিযান চালান। এ সময় আজিজুল ইসলাম (৪০) ও সেন্টু শেখ (৩৫) নামে দুজন দালাল আটক করেন তাঁরা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আজিজুল ইসলামকে এক মাসের কারাদণ্ড ও সেন্টু শেখকে দেড় হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বিচারক ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদা পারভীন।
