সৌদি আরব, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) যেন সোনার হরিণ। এ কারণে অধিকাংশ প্রবাসীর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারা অবৈধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। নবায়নের জন্য আবেদন করলে ৪-৫ মাসেও মিলছে না নতুন পাসপোর্ট।ফলে বাংলাদেশি প্রবাসীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। খোদ সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ অভিযোগ করেছেন, পাসপোর্ট নিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না প্রবাসীরা। এমন সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে লেখা চিঠিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাঙালিরা দীর্ঘ সময় (৪-৫ মাস) অপেক্ষায় থেকেও মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) পাচ্ছেন না।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরে যোগাযোগের পর তারা জানায়, পাসপোর্ট বইয়ের স্বল্পতা রয়েছে। বিদেশে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রবাসীরা সময়মতো পাসপোর্ট না পেলে অবৈধ হওয়ার আশঙ্কাসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। এ জন্য সময়মতো মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দেয়া খুবই জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির অভিযোগ, সৌদি আরবের জেদ্দায় অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশ কনসুলেটের কোনো তদারকি নেই। সেবার পরিবর্তে সেখানে চলছে নানা অনিয়ম। প্রবাসীরা প্রতিবাদ করলেও কোনো কাজ হয় না।
তাদের দাবি, যে প্রতিবাদ করেন তার পাসপোর্ট নবায়ন হয় অনেক পরে। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসীদের দুঃখ-কষ্ট বুঝলেও কনসুলেটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। প্রবাসী শ্রমিকদের কোনো কথাই শুনতে চান না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৮-১০ লাখ বাংলাদেশির সরকারি সেবা নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ জেদ্দা কনসুলেট। ১২ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার পাসপোর্ট জেদ্দা কনসুলেটে পৌঁছে অথচ এ সময়ের মধ্যে গ্রাহককে ডেলিভারি দেয়ার জন্য তা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।
চলতি বছর প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ বাংলাদেশি পাসপোর্ট রি-ইস্যুর জন্য আবেদন জমা দেন। ২০১৪-২০১৫ সালে বাধ্যতামূলক এমআরপি করার ফলে প্রায় সবাই একযোগে মেয়াদ উত্তীর্ণের কবলে পড়েছেন। এতে অতিরিক্ত চাপ বাড়ছে। পাসপোর্ট নেয়ার জন্য কনসুলেটের সামনে লম্বা লাইন থাকে।
অনেক প্রবাসী কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কাউন্টারে যেতে যেতে বিকাল ৪টা বেজে যায়। তখন কনসুলেটের পাসপোর্ট অফিস বন্ধ করে দেন কর্মকর্তারা। ৭০০-৮০০ কিলোমিটার দূর থেকেও প্রবাসীরা সেবা নিতে আসেন। তবে দালালদের মাধ্যমে গেলে দ্রুত কাজ হয় বলে জানিয়েছেন অনেকে।
প্রবাসীদের অভিযোগ, জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় ক্ষমতাসীন দলের (আওয়ামী লীগ) সহযোগী সংগঠনের নামে ব্যাঙের ছাতার মতো সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনের কিছু নেতা, ভুঁইফোঁড় সাংবাদিক ও কনসুলেটের কিছু অসাধু কর্মকর্তা মিলে সিন্ডিকেট করে পাসপোর্টের কাজ করছে।
তাদের মতে, এই চক্রটি ৩০ থেকে ৪০ হাজার রিয়ালে চুক্তিভিত্তিক রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিচ্ছে। অনেকে এই দালালি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। অথচ প্রকৃত বাংলাদেশি প্রবাসীরা তাদের কাছে পাত্তা পাচ্ছেন না। জেদ্দা, মক্কা ও মদিনার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রবাসী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদকের কাছে উল্লিখিত বিষয়ে অভিযোগ করেন।
অভিযোগ অস্বীকার করেননি সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহও। তিনি বলেন, এমআরপি বইয়ের স্বল্পতা রয়েছে যেমন সত্য, তেমনি কনসুলেটের কিছু কর্মকর্তারও সমস্যা রয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রবাসীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। প্রবাসী শ্রমিকদের ভিসা-পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধানের জন্য তিনিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বলে জানান।
জানা গেছে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে ২০১৫ সালের নভেম্বরে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট চালু করে বাংলাদেশ। এরপর ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল পাসপোর্ট সেবা সপ্তাহ উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ই-পাসপোর্ট (ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট) প্রদানের ঘোষণা দেন। ই-পাসপোর্টের জন্য ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই জার্মানির ভেরিডস নামের একটি কোম্পানির মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়।
২২ জানুয়ারি ই-পাসপোর্টের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে এমআরপির পাশাপাশি প্রথম দফায় ঢাকার আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী এবং উত্তরা পাসপোর্ট অফিস থেকে ই-পাসপোর্ট সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে পাসপোর্টের জন্য কমবেশি ৫ লাখ আবেদন জমা পড়েছে।
এমআরপি সংকটের বিষয়ে সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরাপত্তা ও বহির্গমন) মোহাম্মদ আজহারুল হক বলেন, গত বছরের জুলাইয়ে ই-পাসপোর্ট চালুর কথা থাকায় পাসপোর্ট অধিদফতর এমআরপি বই প্রস্তুত কমিয়ে দেয়। এছাড়া পাসপোর্ট বই প্রস্তুতকারী মেশিন পুরনো হওয়ায় উৎপাদন ক্ষমতাও কমে গেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা- পাঁচ বছর মেয়াদি এমআরপি পাসপোর্টের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষের দিকে। ফলে নবায়নের নিয়মিত আবেদনের পাশাপাশি এমআরপি পাসপোর্টেরও নবায়নের আবেদন করেছে প্রায় সবাই। ফলে একটা বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে পাসপোর্ট অধিদফতর। ইতিমধ্যে এমআরপির পাশাপাশি ই-পাসপোর্ট দেয়া হচ্ছে। আশা করি, শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।
