উদ্ধার নয়, উত্তরণে মনোযোগী বিশ্ব অর্থনীতি
রোনা মহামারি ছয়টা মাস ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে চেপে ধরে রেখেছে। তলানিতে নেমেছে প্রবৃদ্ধি, বেকার হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। অর্থনীতিকে বাঁচাতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঢালছে বড় দেশগুলো। এত সবের পরেও কি আগের অবস্থানে যাওয়া সম্ভব হবে? এই সহায়তাই কি যথেষ্ট হচ্ছে?
বড় বড় দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন উদ্ধার থেকে সরে উত্তরণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। কারণ, ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে নেমে এসেছে অর্থনীতি। এত দিন সবকিছু লকডাউন করে অর্থনীতি বাঁচাতে তারা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। এবার লকডাউন শিথিল করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করতে আরও ব্যয় করতে যাচ্ছেন তাঁরা। এতেই কিছু আশা জাগছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। এপ্রিলে বিশ্ব অর্থনীতি সংকুচিত হয় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ মে মাসে এই সংকোচন কমে হয়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, নীতিনির্ধারকেরা খাদ্য-স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ে অর্থ বরাদ্দ থেকে সরে উত্তরণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের যে অর্থ–সংকট রয়েছে, তা ঋণ–সংকটে রূপান্তরিত হওয়ার আগেই তাঁদের সহায়তা করা প্রয়োজন। উত্তরণের অংশ হিসেবে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও কোম্পানিকে আর্থিক সহায়তা দিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে নতুন দফায় বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিচ্ছে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। গত সপ্তাহে ইউরোপিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) তার সম্পদ ক্রয় কর্মসূচি ৬০০ বিলিয়ন ইউরো থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ইউরো করার ঘোষণা দিয়েছে। ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত এই কর্মসূচি চালাবে তারা। জার্মান সরকার নতুন করে ১৩০ বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রস্তাবিত ৭৫০ বিলিয়ন ইউরোর নতুন পুনরুদ্ধার তহবিলেও তারা সহায়তা দেবে। ইসিবির প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা লাগার্দে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ব্যবস্থা নিতে হবে।
এদিকে কেবল ইউরোপ নয়, একই ধরনের নীতি নিয়েছে এশিয়াও। জাপান ইতিমধ্যে আরও ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে। এর আগে এত বড় ব্যয়ের পরিকল্পনা করেনি তারা। এ ছাড়া মে মাসে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ২৭৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণসহায়তা প্রদানের জন্য জরুরি বৈঠক ডেকেছে। গত সপ্তাহে আরও ৫০৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে চীন। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া ৬৩ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
মার্কিন আইনপ্রণেতারাও আরও বেশি পরিমাণে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ইতিমধ্যে দেশটির অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থায় লাখ লাখ কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে। আবার সম্প্রতি ‘মেইন স্ট্রিট লেন্ডিং প্রোগ্রাম’ নামে নতুন একটি কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে তারা। ১০ জুন ফেডের পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। অর্থনীতিবিদেরা ধারণা করছেন, এই বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের বাকি সময়টায় মুদ্রানীতি শিথিল রাখার প্রতিশ্রুতি আরও পাকাপোক্তভাবে দেবে।
এদিকে লকডাউন শিথিলের পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি। অপ্রত্যাশিতভাবে মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার কমেছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মে মাসে দেশটির বেকারত্বের হার কমে হয়েছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এপ্রিলেই এই হার ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। মে মাসে কর্মসংস্থান হয়েছে ২৫ লাখ মানুষের। এই বেকারত্ব কমার এ চিত্র বিশ্লেষকদের মনে আশা জাগাচ্ছে। তাঁরা মনে করছেন, মহামারির প্রভাব যতটা আশঙ্কা করা হচ্ছে, ততটা হয়তো পড়বে না অর্থনীতিতে। বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। মে মাসে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার কর্মী নিয়োগ নেওয়া শুরু করেছে। খাদ্য, নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্থাগুলো নতুন অনেক কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। শিক্ষা ও খুচরা খাতে নতুন নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে এই মাসে ২৫ লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে। মূলত মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলো করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে নেওয়া কঠোর ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করায় এই কর্মসংস্থানগুলো আবার ফিরে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য খোলার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিগুলো আবার কর্মী নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছে।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যেসব সহায়তা প্যাকেজের অনুমোদন ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়। কারণ, প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর আগেই পুনরুদ্ধারেই সব সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। লাখ লাখ পরিবার এবং ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য লাখ লাখ ডলার অর্থসহায়তা দেওয়া সত্যিই কঠিন। আরেকটি ঝুঁকি হবে কঠোর ব্যয় সংকোচননীতি। বিভিন্ন দেশ নানা ধরনের ব্যয় সংকোচননীতি গ্রহণ করছে, যা অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।